পরিকল্পনা চলছিল অনেকদিন আগে থেকেই। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বোধন হয়ে গেল কলকাতায় আন্তর্জাতিক মানের হকি স্টেডিয়ামের (Hockey Stadium)। ফুটবলের জন্য পরিচিত বিবেকানন্দ যুবভারতী স্টেডিয়াম এবার মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে হকির জন্যও। পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মজা করেই বলছিলেন, ‘‘স্টেডিয়ামের ভিতর স্টেডিয়াম আর কোথায় আছে।’’ কথাটা নেহাৎই ভুল নয়। আদ্যপ্রান্ত একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের মধ্যেই তৈরি হয়েছে এই হকি স্টেডিয়াম, নাম বিবেকানন্দ যুবভারতী হকি স্টেডিয়াম। বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মঞ্চ থেকে এই স্টেডিয়াম উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার সেই স্টেডিয়াম থেকেই বেটন কাপের উদ্বোধন ঘোষণা করে গেলেন ক্রীড়ামন্ত্রী। ছিলেন বেঙ্গল হকির প্রেসিডেন্ট মন্ত্রী সুজিত বসু, সচিব ইস্তিয়াক আলি।
২২ হাজার দর্শক আসন বিশিষ্ট ভারতের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক মানের এই হকি স্টেডিয়াম এদিন সাংবাদিকদের ঘুরিয়ে দেখান স্বয়ং ক্রীড়ামন্ত্রী।অত্যাধুনিক এই হকি স্টেডিয়ামটিতে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সিন্থেটিক টার্ফ, আর্দেন গ্যালারি, দু’টি অত্যাধুনিক সুসজ্জিত ড্রেসিংরুম, প্রেস কর্নার, ভিডিও অ্যানালেসিস্ট রুম, ভেন্যু পরিচালনা কেন্দ্র, ইন্ডোর প্র্যাক্টিস গ্রাউন্ড, ভিআইপি রুম-সহ যাবতীয় আন্তর্জাতিক সুবিধে সম্পন্ন একটি সম্পূর্ণ স্টেডিয়াম পেল বাংলার হকি। ক্রীড়ামন্ত্রীর বিশ্বাস এর পর বাংলার হকিতে উঠে আসবে প্রতিভারা। লক্ষ্য ভারতীয় অলিম্পিক দলে ভারতের প্রতিনিধি। তবে বাংলার এই আন্তর্জাতিক মানের হকি স্টেডিয়ামের উদ্বোধন হল ভারতীয় হকির ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে। যা তাৎপর্যপূর্ণ। আর যার উদ্বোধন হচ্ছে বেটন কাপের মতো ঐতিহাসিক টুর্নামেন্ট দিয়ে।
১৮৯৫ সালে শুরু হওয়া বেটন কাপ এখনও চালিয়ে যাচ্ছে বাংলার হকি। অমেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গেলেও বন্ধ হয়নি তা। রাজ্য সরকারের উদ্যোগ এই টুর্নামেন্টকে আরও উন্নত করবে নিশ্চিত। এদিন ১২৬তম বেটন কাপ উদ্বোধনের মঞ্চ থেকেই সঞ্চালকের মুখে শোনা গেল এক অভিনব কাহিনি। ১৯২৮-এর অলিম্পিকে যখন ভারতীয় দল অংশ নিতে যাচ্ছে তখন তাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। সেই সময় ভারতীয় দলের পাশে দাঁড়িয়েছিল বেটন কাপ আয়োজকরা। আমস্টারডমের সেই অলিম্পিক ভারতীয় হকির জন্য নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছিল।
হকি বেঙ্গলের সভাপতি সুজিত বসু বলছিলেন, ‘‘বাংলার হকির জন্য আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন। ডুমুরজোলার পর এই হকি স্টেডিয়াম বাংলার হকির উপর প্রভাব ফেলবে আমি নিশ্চিত। বাংলা থেকে ভেস পেজ, গুরবক্স সিং, ধ্যানচাঁদের মতো তারকা হকি প্লেয়াররা উঠে এসেছিলেন এক সময়। এখন লক্ষ্য নতুন প্রজন্মকে তুলে আনা। আমার অনুরোধ সংবাদ মাধ্যমের কাছে এর প্রচার ভালো করে হোক যাতে সবার কাছে আগ্রহ তৈরি হয়।’’
তাঁঁর কথার রেশ ধরেই ক্রীড়ামন্ত্রী বলেন, ‘‘এই স্টেডিয়াম বাংলার গর্ব। হকি বেঙ্গল প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ বাংলার হকি নতুন করে তুলে আনার জন্য। আমাদের আশা ভারতীয় দলে দ্রুত বাংলার প্লেয়াররা খেলবে। বাংলার প্লেয়াররা অলিম্পিকে খেলবে। এর পাশাপাশি আমরা একটা হকির জন্য অ্যাকাডেমিতে তৈরি করব। আমরা জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেব সব খেলাকে। সেখান থেকে প্রতিভা তুলে আনব। যে কাজ আমার শুরু করে দিয়েছি বিভিন্ন খেলার ক্ষেত্রে।’’
এর পাশাপাশি তিনি সবার কাছে অনুরোধ করেন যদি কেউ কোথাও কোনও প্রতিভা দেখতে পায় তাহলে যেন ক্রীড়া দফতরকে জানায়। তাহলে সেই প্রতিভাকে তুলে এনে তাঁকে তৈরি করার দায়িত্ব নেবে রাজ্য সরকার। তিনি বলেন, ‘‘এই স্টেডিয়াম তৈরি করার অনুমোদন পাওয়ার পর পিডব্লুডি-র কর্মকর্তারা যাঁরা এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা ভারতের সব হকি স্টেডিয়াম ঘুরে দেখার পর কলকাতা ফিরে এই স্টেডিয়ামের পরিকল্পনা করে। এটা পুরোটা আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনা। আমরা কিছু বইয়েরও সাহায্য নিয়েছি।’’
এই মঞ্চ থেকেই ক্রীড়ামন্ত্রী জানিয়ে দেন স্কুল হকির সেমিফাইনাল ও ফাইনাল হবে এই আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামেই। সঙ্গে মেয়েদের হকিকে ফেরানো এবং কলকাতার তিন বড় ক্লাব ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ও মহমেডানের হকি দলকে ফেরানোর চেষ্টার কথাও জানালেন তিনি। একটা সময় এই তিন ক্লাবের লড়াই ফুটবল মাঠের মতোই হকির মাঠেও ছিল একইরকম উত্তেজনার। সেটাই ফিরে পেতে চাইবে হকির ময়দান। সঙ্গে কলকাতা ময়দানে কলকাতা লিগের ফেরা, হকিকে অ্যাস্ট্রোটার্ফে নিয়ে যাওয়া-সহ একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন অরূপ বিশ্বাস। জানালেন এই স্টেডিয়াম তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা।
ধরেই নেওয়া যায় প্রতিবার সাইয়ের টার্ফে খেলতে গিয়ে যে পরিমাণ সমস্যায় পড়েন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্লেয়াররা, এবার আর তা হবে না। শনিবার থেকে এই মাঠেই শুরু হয়ে যাবে খেলা, যা অন্য এক অনুভূতি। এবার বাড়ানো হয়েছে বেটন কাপের পুরস্কার মূল্যও। যেখানে চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ১০ লাখ টাকা ও রানার্স দল পাবে ৫ লাখ টাকা। লাইভ স্ট্রিমিং দেখা যাবে এসএসইএন অ্যাপে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবরে
