কলকাতায় সফলভাবে শেষ হল চতুর্থ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া চলচ্চিত্র উৎসব (Sports Film Festival) অব ইন্ডিয়া (ISFFI)। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসাধারণ ক্রীড়াভিত্তিক চলচ্চিত্র উদযাপনের পাশাপাশি সাহস, সংঘাত, সংস্কৃতি ও মানবিক দৃঢ়তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের শক্তিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছে এই উৎসব। ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া (FFSI) ও সোশ্যাল স্পোর্টস ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত পাঁচদিনব্যাপী এই উৎসব আবারও কলকাতাকে ক্রীড়া-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক গল্প বলার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চলতি বছরের সেরা কল্পকাহিনি চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নিয়েছে ইরানের ছবি ‘মাডি ফুট’ (২০২৫), পরিচালনায় মহম্মদ-এব্রাহিম আজিজি। ফুটবলকে পটভূমি করে নির্মিত এই ছবিটি তাঁর গভীর নৈতিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। জুরিদের বক্তব্য অনুযায়ী, “নৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে ফুটবলকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করে ব্যক্তিগত ক্ষতিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ সমালোচনায় রূপান্তর করার জন্য ছবিটিকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।”
সেরা নন-ফিকশন চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার তথ্যচিত্র ‘ডোন’ট লুক অ্যাওয়ে’ (২০২৫), পরিচালনায় অ্যাশলি ম্যালকম মরিসন। একজন ক্রীড়াবিদের নীরব প্রতিবাদের অসাধারণ কাহিনি তুলে ধরা এই ছবিটি প্রশংসিত হয়েছে “ইতিহাসে ক্রীড়া ও সাহসের মিলনকে আবেগঘনভাবে তুলে ধরার জন্য।” আবেগী গভীরতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ছবিটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
চরম ক্রীড়া বিষয়ক সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে বুলগেরিয়ার তথ্যচিত্র ‘প্যারালাল ওয়ার্ল্ড’ (২০২৪)-কে, পরিচালনায় আলেকজান্ডার ভালচেভ। জুরি ছবিটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে “একটি গোপন ক্রীড়া জগতের উন্মোচনের জন্য, যেখানে মূলধারার স্বীকৃতির অনেক বাইরে আবেগ, ঝুঁকি ও সহনশীলতা বিরাজ করে।” ২১ মিনিটের এই তথ্যচিত্রটি মানুষের সক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় পরিচালিত চরম ক্রীড়ার এক নিবিড় ও গভীর চিত্র তুলে ধরেছে।
ভারতীয় তথ্যচিত্র ‘ফোক গেমস অফ বেঙ্গল’ (২০২৪), পরিচালনায় ধনঞ্জয় মণ্ডল, পেয়েছে বিশেষ জুরি সম্মাননা। বাংলা ভাষায় নির্মিত এই ছবিটি “বিলুপ্তপ্রায় খেলাধুলার ঐতিহ্য সংবেদনশীলভাবে নথিভুক্ত করা এবং ক্রীড়া ও সমাজের সাংস্কৃতিক শিকড় সংরক্ষণের জন্য” স্বীকৃতি লাভ করেছে। ছবিটিতে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় বিলুপ্ত দেশজ খেলাগুলি তুলে ধরা হয়েছে, যা ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।
উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে আয়োজিত হয় এক বিশেষ টক শো, যেখানে বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব শ্রী প্রবীর মিত্র, শ্রী গোপীনাথ ঘোষ, শ্রী চিত্ত বিশ্বাস (চিরঞ্জীব) ও শ্রী সাধন দত্ত ভারতের সমৃদ্ধ ক্রীড়া ঐতিহ্য নিয়ে নিজেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয় ১৯৭৫ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ, যার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপিত হয় এ বছর।
এই উপলক্ষে ক্রোয়েশিয়া সরকার বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়ন আন্তুন তোভা শিপানচিচ (Antun Tova Šipančić)-এর জীবন ও কৃতিত্ব এবং ১৯৭৫ সালে কলকাতার সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক সংযোগ তুলে ধরে একটি বিশেষ অনুপ্রেরণামূলক চলচ্চিত্র পাঠায়। এই প্রথমবার কোনও ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রোয়েশিয়া সরকারের পাঠানো কোনও ছবি প্রদর্শিত হলো, যা উৎসবের আন্তর্জাতিক মাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
এবছর ISFFI-তে ১৭টি দেশের ৩৬টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিন, ইরান, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত। কল্পকাহিনি, তথ্যচিত্র ও চরম ক্রীড়া—এই তিনটি বিভাগে বৈচিত্র্যময় গল্প দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীর মধ্যে ছিল মীরা নায়ারের ‘কুইন অফ কাটওয়ে,’ রীমা কাগতির ‘গোল্ড’, ইরা দেওকুলের ‘অ্যাথলিটস আর ম্যাড’, সৈয়দ আব্বাস হোসেইনির ‘চেখভ’স গান’, অ্যাডাম লাপালো’র ‘আনটাচেবল’, রোসৌরা আরান্ডার ‘আনটিল ডেথ’, দিমিত্রি ভিংগুরস্কির ‘বিলিভ ইন আ ড্রিম’ এবং অর্ণব রিঙ্গো বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেসি’।
আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্বাচন ও ভাবনাপ্রবণ গল্প বলার মাধ্যমে ৪র্থ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া চলচ্চিত্র উৎসব অব ইন্ডিয়া সফলভাবে এমন সব কাহিনি উদযাপন করেছে, যা ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে ক্রীড়ার সার্বজনীন চেতনাকে তুলে ধরে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
