প্রথম ভারতীয় হিসেবে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া (passive euthanasia)’ বা নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি পাওয়া হরিশ রানা (Harish Rana) ১৩ বছরেরও বেশি সময় কোমায় থাকার পর স্বেচ্ছ্বা মৃত্যু বরণ করলেন। দিল্লির এইমস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে হরিশ রানা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বাবা-মায়ের অনুরোধে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ‘লাইফ সাপোর্ট’ বা জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা প্রত্যাহার করার অনুমতি দেওয়ার প্রায় দু‘সপ্তাহ পর এই ঘটনা ঘটল। ৩১ বছর বয়সী রানা-কে স্বেচ্ছামৃত্যু প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে গত ১৪ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর দু’দিন পর, তাঁর লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহার করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এরপর ১১ দিন কেটে যাওয়ার পর রানা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ভারতের আইনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার পাশাপাশি রানার পরিবার তাঁর দু’টি কর্নিয়া ও হৃদপিণ্ডের ভালভসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো দান করে দিয়েছে।
একটি দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে রানা ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা সম্পূর্ণ অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন। ২০১৩ সালে, যখন তিনি পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছিলেন, তখন একটি ‘পেয়িং গেস্ট’ আবাসনের চারতলা থেকে নিচে পড়ে যান। এই দুর্ঘটনার ফলে তাঁর মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে। পরবর্তীতে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, মস্তিষ্কের আঘাতের কারণে তিনি কোমায় চলে যান। লাইফ সাপোর্টে রাখা অবস্থায় তিনি সম্পূর্ণভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য তাঁর শরীরে একটি ‘ট্রাকিওস্টমি টিউব’ এবং খাবার গ্রহণের জন্য একটি ‘গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টমি টিউব’ লাগানো ছিল।
বছর গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন তাঁর বাবা-মা শেষমেশ আদালতে গিয়ে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’-র অনুমতি চেয়ে আবেদন জানান।
গত ১১ মার্চ, সুপ্রিম কোর্ট রানাকে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকার’ প্রদান করে। এর মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো আইনগতভাবে অনুমোদিত কোনও ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর ঘটনা বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হল। আদালত তাঁর রায়ে উল্লেখ করে, “চিকিৎসা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, গত ১৩ বছরে রোগীর অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি।” আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, একজন রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা চিকিৎসকের যে কর্তব্য, তা “আর বহাল থাকে না যখন রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও আশাই অবশিষ্ট থাকে না।”
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সরকারকেও ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের জন্য আহ্বান জানায়। আদালতের সেই ঐতিহাসিক রায়ের তিন দিন পর, গাজিয়াবাদে নিজের বাড়ি থেকে রানাকে দিল্লির এইমস হাসপাতালের ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিট’ বা প্রশমন সেবা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে, চিকিৎসা সেবা প্রত্যাহার করার বিষয়টি অবশ্যই একটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা মেনে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে রানার মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি—যার অন্তর্ভুক্ত ছিল রানার কৃত্রিম পুষ্টি সহায়তা এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহার করা—তদারকি করার জন্য চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছিল। অ্যানেস্থেশিয়া ও প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সীমা মিশ্রের নেতৃত্বে গঠিত এই দলে নিউরোসার্জারি, অনকো-অ্যানেস্থেশিয়া, প্যালিয়েটিভ মেডিসিন এবং মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চিকিৎসকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এই দলের তত্ত্বাবধানেই ভারতে প্রথমবারের মতো ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ (নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যু) সম্পন্ন করা হয়। ৩১ বছর বয়সে অত্যন্ত শান্তিতেই রানার মৃত্যু হয়।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালে ‘অরুনা শানবাগ বনাম ভারত সরকার’ মামলায় এই রায়টি ঘোষিত হয়। সেই সময় আদালত শানবাগের জন্য প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার আবেদন জানিয়ে করা একটি পিটিশন খারিজ করে দিয়েছিল। শানবাগ ছিলেন একজন নার্স, যিনি একটি যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় (মস্তিষ্কের কার্যকারিতা লুপ্ত অবস্থায়) ছিলেন। আবেদনটি খারিজ করার মূল কারণ ছিল—যে হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল, সেখানকার কর্মীরা চেয়েছিলেন তিনি যেন বেঁচে থাকেন। ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শানবাগের মৃত্যু হয়।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
