দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে এক বছর। ২০২৫ সালের ১২ জুনের দুপুরে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ভয়ঙ্কর খবর। গুজরাটের আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে ওড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ১৭১ (Air India 171); এই দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন একজন। বাকি সবার মৃত্যু হয়। তার সঙ্গে মৃত্যু হয় যে ডাক্তারি পড়ুয়াদের হস্টেলের উপর ভেঙে পড়েছিল সেই বিমান সেই হস্টেলের আবাসিকদের অনেকের। শুধু কী তাই, সেই সময় তার আশপাশে থাকা বা হেঁটে যাওয়া বেশ কয়েকজনেরও এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর উঠে আসে। সেই বিমান দুর্ঘটনার আজ এক বছর।
ভেঙে পড়া বিমানের ধ্বংস্তুপের মধ্যে থেকে হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে বেরিয়ে আসতে দেখে চমকে গিয়েছিলেন সেখানে উপস্থিত অনেকেই। তার পরটা তো ইতিহাস। তার কাহিনী এখনও মুখে মুখে ঘোরে দেশ থেকে দেশান্তরে। সেই মুহূর্তের ছবি বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। একমাত্র জীবিত ব্যক্তি বিশ্বাসকুমার রমেশ। কেমন আছেন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি?
আজ, এক বছর পর, রমেশ বলছেন যে তিনি একাধিক সমস্যায় জর্জরিত। ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ এবং কঠিন সব স্মৃতির সঙ্গে আজও লড়াই করে চলেছেন তিনি। রমেশ বলেন, ‘‘মানুষ দেখতে পায় যে আমি বেঁচে গিয়েছি, কিন্তু পর্দার আড়ালে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তা তারা সবসময় দেখতে পায় না। এক বছর পরেও আমি আমার জীবন নতুন করে সাজানোর এবং সাধ্যমতো পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’’ বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটিতে ১২ জন ক্রু-সহ মোট ২৪২ জন যাত্রী ছিলেন।
২০২৫ সালের ১২ জুন ওড়ার প্রায় ৩২ সেকেন্ড পর বিমানটি একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস ও ক্যান্টিন ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। এই ঘটনায় ২৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে ২৪১ জন ছিলেন বিমানের যাত্রী ও ক্রু এবং ১৯ জন ছিলেন সেই এলাকায় থাকা ব্যক্তি।
৩৯ বছর বয়সী রমেশ, যিনি সপরিবারে লেস্টারে বসবাস করেন, এই দুর্ঘটনায় তাঁর ভাই অজয়কে হারান। তিনি বলেন, এই ঘটনা তাঁকে মানুষ হিসেবে বদলে দিয়েছে। রমেশ বলেন, ‘‘বেঁচে থাকার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, তবে বেঁচে থাকাটা গল্পের কেবল একটি অংশ মাত্র। এরপর থেকে আমি যা কিছুর মুখোমুখি হয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’’ তিনি আরও জানান যে, তিনি এখনও শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছেন।
রমেশ তাঁর আইনি বিষয়গুলো দেখার জন্য যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হাডজেল সলিসিটরস’-কে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি এই দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সম্ভাব্য দেওয়ানি দাবির বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসন সহায়তার বিষয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে “গঠনমূলক” আলোচনা চলছে। এয়ার ইন্ডিয়ার একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘‘এয়ার ইন্ডিয়া এআই১৭১ (AI171) ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে যত্ন ও সহানুভূতির সঙ্গে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’
লেস্টার-ভিত্তিক কমিউনিটি নেতা এবং রমেশের পরিবারের উপদেষ্টা সঞ্জীব প্যাটেল বলেন, “তিনি [রমেশ] কারও সহায়তা ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারেন না। তিনি মারাত্মক মানসিক আঘাত বা ট্রমার শিকার… এবং সেই ক্ষতগুলো দীর্ঘ সময় ধরে, এমনকি চিরকাল তাঁর সঙ্গে থেকে যাবে।’’ প্যাটেল আরও বলেন, ‘‘এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারই মানসিক আঘাত বা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। আর বিশ্বাস [রমেশ] ও তাঁর পরিবারের জন্য এই ঘটনাটি এতটাই বিপর্যয়কর ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।’’
গত মার্চ মাসে, এই দুর্ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়েও আহমেদাবাদে ‘এয়ার অ্যাকসিডেন্টস ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ’ (AAIB)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে রমেশ দেখাও করেছিলেন।
যুক্তরাজ্যের ‘এয়ার অ্যাকসিডেন্টস ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ’—যারা বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ভারতীয় তদন্তকারীদের সাহায্য করছে—জানিয়েছে, ‘‘এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন দেশের মানুষের প্রতি আমাদের গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা রয়েছে।’’
তবে আজও তদন্ত শেষ হয়নি। আজও জানা যায়নি কীভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা। কেমন আছেন মৃতদের পরিবার। কেমন আছেন সেই বাবা, যিনি তাঁর একমাত্র পাইলট ছেলেকে হারিয়েছেন বৃদ্ধ বয়সে। কেমন আছে সেই দুই সন্তান যাঁরা কাকার কাছে বাবা, মায়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিল? কেউ জানে না। কেউ জানে না কবে জানা যাবে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ? আদৌ কি জানা যাবে?
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
