ভারতীয় পরিবারগুলোতে ‘ভাতের চেয়ে রুটি (Rice or Roti) কি বেশি স্বাস্থ্যকর’—এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মতো সাধারণ বিতর্ক খুব কমই দেখা যায়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই আলোচনাটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার সরাসরি রক্তে শর্করার মাত্রাকে প্রভাবিত করে। এই বিতর্কটিকে কেবল ভাত বর্জন বা রুটির গুণগান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের কার্বোহাইড্রেট কীভাবে শরীরকে প্রভাবিত করে এবং খাবারের সংমিশ্রণ, পরিমাণ ও খাওয়ার ক্রম কীভাবে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করতে পারে—সে সব বিষয়ও বোঝা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাত কোনও শত্রু নয়, তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া ব্যক্তিদের জন্য সাধারণত রুটিই একটি ভালো বিকল্প। তবে এক্ষেত্রে কেন ভাতের তুলনায় রুটি এগিয়ে সেটাও জানা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রুটি সাধারণত নিরাপদ পছন্দ, কারণ এটি একটি ‘কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট’ বা জটিল শর্করা। জটিল শর্করা হজম হতে বেশি সময় নেয়, যার ফলে রক্তপ্রবাহে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে মিশতে পারে। অন্যদিকে ভাত, বিশেষ করে সাদা চালের ভাত, দ্রুত হজম হয়ে যায়। এর ফলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যরুটির তুলনায় ভাত সবসময়ই বেশি সমস্যাজনক।
রুটি খাওয়ার পাশাপাশি রুটির পুষ্টিগুণ বাড়ানো প্রয়োজন। সাধারণ গমের আটার পরিবর্তে একটি স্বাস্থ্যকর মিশ্রণের আটা যদি ব্যবহার করা যায় তাহলে সেটা অনেকবেশি স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠতে পারে। যাতে বেসন (ছোলা বা বুটের ডালের আটা), মিলেট বা জোয়ার এবং সামান্য পরিমাণে গমের আটা থাকবে। এতে প্রোটিন, ফাইবার ও জটিল শর্করার পরিমাণ বাড়ে এবং খাবারের ফলে রক্তে শর্করা বাড়ার প্রবণতা কমে।
ভাতও খাওয়া যেতে পারে, তবে প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতি। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় একটি ভুল ধারণা হল, রোগীদের খাদ্যতালিকা থেকে ভাত পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। বর্তমানে এই ধারনার অনেকটাই বদল এসেছে। সঠিক উপায়ে খেলে ভাতও ডায়াবেটিস রোগীর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। ব্রাউন রাইস বা লাল চালের ভাত বেশি ভালো, কারণ এতে ফাইবারের পরিমাণ বেশি থাকে। এছাড়া ‘পারবয়েলড রাইস’ বা সেদ্ধ চালের ভাতও খাওয়া যেতে পারে কারণ এটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত হওয়ার কারণে এর গ্লাইসেমিক প্রভাব কম থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভাতের সঙ্গে কী খাবেন? ভাতের সঙ্গে ডাল বা রাজমার মতো প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। এটি কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি কমিয়ে দেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া রোধ করে।
খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা ভাত খেতে চান, তাদের উচিত খাবারের বাকি অংশ সে অনুযায়ী সমন্বয় করা; কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে বাড়তি ভাত যোগ করা উচিত নয়। মূল রহস্য কেবল খাবারেই নয়, বরং তা খাওয়ার ক্রম বা ধারায় নিহিত রয়েছে। খাবারটি কী, তার পাশাপাশি সেটি কীভাবে বা কোন সময়ে খাওয়া হচ্ছে—তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
“প্রি-লোড” (pre-load) বা মূল খাবারের আগে কিছু খেয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মূল খাবারের আগে শসা, টমেটো, বাঁধাকপি, গাজর বা মূলোর মতো সবজি দিয়ে তৈরি দুই বাটি সালাদ খাওয়া যেতে পারে। খাবার শুরুর অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগে এটি খাওয়া প্রয়োজন। যদি ভাত খায় , তবে ভাতে হাত দেওয়ার আগে কয়েক চামচ ডাল বা রাজমা খেয়ে দ্বিতীয় ধাপের “প্রি-লোড” সম্পন্ন করা যেতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়ার আগে সবজি ও প্রোটিন খেলে খাওয়ার পরবর্তী সময়ে রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
আসল কথা হল, কোনও কিছু পুরোপুরি বর্জন করার চেয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা বেশি জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রুটি না ভাত—এই বাছাইয়ের বিষয়টি খুব সহজে হ্যাঁ বা না-এ উত্তর দেওয়া মুশকিল। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে সাধারণত ভাতের চেয়ে রুটি বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবে এর মানে এই নয় যে কোনও একটিকে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত কার্বোহাইড্রেটের গুণমান উন্নত করা, খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবারের (ফাইবার) পরিমাণ বাড়ানো এবং খাবার খাওয়ার সঠিক ক্রম বা নিয়ম মেনে চলার ওপর।
ভাত নাকি রুটি—কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে মানুষের বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ভাবা উচিত: আমি কীভাবে আমার পুরো খাবারের রুটিনকে আরও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারি? বিশেষজ্ঞদের মতে, চিন্তাধারার এই পরিবর্তনটিই হতে পারে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
