পাঁচ ঘণ্টার ট্রেন যাত্রা যদি আপনার কাছে দীর্ঘ মনে হয়, তবে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একই ট্রেনে থাকার কথা কল্পনা করুন। যখন আপনি ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়েতে (Trans-Siberian Railway) থাকবেন, তখন দেখবেন দৃশ্যপট শহর থেকে বন, পাহাড়, হ্রদ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের রঙও পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বের দীর্ঘতম একক রেল ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তিতুল্য রেললাইনটি রাশিয়ার পশ্চিমে মস্কো থেকে সুদূর পূর্বে ভ্লাদিভোস্তক পর্যন্ত বিস্তৃত। ৯,২৮৯ কিলোমিটার (৫,৭৭২ মাইল) দীর্ঘ এই সম্পূর্ণ যাত্রায় প্রায় ছয় থেকে সাত দিন সময় লাগে এবং এই পথে আটটি টাইম জোন অতিক্রম করতে হয়।
ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়েকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রেলযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি দিনই নতুন ভূদৃশ্য, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন গল্প নিয়ে আসে, যারা ধীরগতির অভিযান ভালোবাসেন এমন ভ্রমণকারীদের জন্য এটিকে একটি স্বপ্নের যাত্রায় পরিণত করে।
ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে একটি বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলগত কৃতিত্ব। জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের শাসনামলে ১৮৯১ সালে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। সেই সময়ে রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ ছিল, কিন্তু এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত ছিল ধীরগতির এবং অত্যন্ত কঠিন পথ। সাইবেরিয়ার অনেক অংশই বিচ্ছিন্ন ছিল, এবং এত বিশাল দূরত্বে মানুষ ও পণ্য পরিবহন করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত।
হাজার হাজার শ্রমিক দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বন, পাহাড়, নদী এবং পৃথিবীর অন্যতম কঠোর শীতের অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে এই রেলপথটি নির্মাণ করেছিল। মূল লাইনটির কাজ ১৯১৬ সালে সম্পন্ন হয়, যা রাশিয়ার পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত একটি অবিচ্ছিন্ন রেল সংযোগ তৈরি করে। আজও এটি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।

এই রেলপথটি কেন এত বিখ্যাত বিশ্ব জুড়ে? এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। শুধুমাত্র সংখ্যাগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন রেলপথ, যা দু’টি মহাদেশ জুড়ে প্রায় ৯,৩০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই যাত্রাপথে ট্রেনটি ৮০টিরও বেশি শহর ও নগরের মধ্যে দিয়ে যায় এবং আটটি ভিন্ন টাইম জোন অতিক্রম করে।
এই রেলপথটি ইউরোপ এবং এশিয়াকেও সংযুক্ত করে, যার ফলে এটি এমন কয়েকটি ট্রেন যাত্রার মধ্যে একটি যেখানে যাত্রীরা ট্রেন পরিবর্তন না করেই দু’টি মহাদেশের মধ্যে ভ্রমণ করতে পারেন। রেলপ্রেমীদের জন্য, এটি জীবনের সেরা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
এই যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো, কীভাবে আপনার চারপাশে সময় নিজেই বদলে যেতে থাকে। আয়তনের দিক থেকে রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ এবং এটি ১১টি টাইম জোন জুড়ে বিস্তৃত। ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে মস্কো থেকে ভ্লাদিভোস্তক পর্যন্ত তার যাত্রাপথে এই টাইম জোনগুলোর মধ্যে আটটি অতিক্রম করে। যাত্রীরা প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারেন এবং দেশজুড়ে ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন রুটিনও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।
এই যাত্রাপথে ট্রেনটি ৮০টিরও বেশি শহর ও নগরের মধ্যে দিয়ে যায়। আর সেটাই হল মানুষের এই রেলওয়ের প্রেমে পড়ার একটি বড় কারণ। চলার পথে বাইরের দৃশ্যগুলো কখনওই দীর্ঘ সময়ের জন্য একই থাকে না। যাত্রাটি মস্কোর ঐতিহাসিক রাস্তা থেকে শুরু হয়ে গ্রামাঞ্চল এবং দুর্গম অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায়।
এর পর ট্রেনটি ইউরাল পর্বতমালার কাছে পৌঁছয়, যা প্রথাগতভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যের প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে বিবেচিত।
সাইবেরিয়া অতিক্রম করার সময় যাত্রীরা দেখতে পান ‘তাইগা’ (taiga) নামে পরিচিত বিশাল বনভূমি, প্রশস্ত নদী, শান্ত গ্রাম এবং উন্মুক্ত প্রাকৃতিক দৃশ্য। যাত্রাপথের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশটি হল বৈকাল হ্রদের (Lake Baikal) কাছাকাছি এলাকা। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানটি বিশ্বের গভীরতম মিষ্টি জলের হ্রদ। বিশ্বের তরল বা জমে-না-যাওয়া ভূপৃষ্ঠস্থ মিষ্টি জলের প্রায় ২০ শতাংশই এখানে রয়েছে। রেলপথের বেশ কিছু অংশ হ্রদের গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে, ফলে যাত্রীরা এর স্বচ্ছ জল ও আশপাশের পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।
অবশেষে, প্রায় এক সপ্তাহ ভ্রমণের পর ট্রেনটি ভ্লাদিভোস্টকে পৌঁছয়; এটি রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের একটি প্রধান বন্দর নগরী।
ট্রেনের ভেতরের জীবনযাত্রা আশ্চর্যজনকভাবে আরামদায়ক
যারা এই ট্রেনে এক সপ্তাহ কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তারা বিভিন্ন ধরণের বগিকে বেছে নিতে পারেন—যেমন শেয়ারড স্লিপিং কম্পার্টমেন্ট (যৌথ শয়নকক্ষ) থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কেবিন। দূরপাল্লার বেশিরভাগ ট্রেনেই ডাইনিং কার (খাবার বগি) ও স্লিপিং বার্থ থাকে এবং কোচগুলো পরিষ্কার ও আরামদায়ক রাখার জন্য সেবাকর্মী বা অ্যাটেনডেন্ট নিয়োজিত থাকেন।
প্রায় প্রতিটি বগিতেই একটি ‘সামোভর’ (samovar) দেখা যায়; এটি গরম জল তৈরির একটি বড় পাত্র যা পুরো যাত্রাপথ জুড়ে বিনামূল্যে গরম জল সরবরাহ করে। যাত্রীরা চা, কফি, নুডলস বা ইনস্ট্যান্ট খাবার তৈরির জন্য এটি ব্যবহার করেন এবং এটি এই রেলপথের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে দ্রুততম ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে বিখ্যাত নয়। এটি বিখ্যাত কারণ এটি ভ্রমণকেই গন্তব্যে পরিণত করে। প্রায় ৯,৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া, আটটি সময় অঞ্চল (time zones) অতিক্রম করা এবং বিশ্বের অন্যতম আইকনিক বা বিখ্যাত রেলপথে প্রায় এক সপ্তাহ কাটানো—এমন অভিজ্ঞতা খুব কম ভ্রমণেই পাওয়া সম্ভব।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
