Jeju Island-এ তিনদিনে নিখোঁজ চার পর্যটকের দেহ উদ্ধার ঘিরে ঘনিভূত হচ্ছে রহস্য

Jeju Island

সেখানে এখনও সেই পাম গাছগুলো রয়েছে। রয়েছে আগ্নেয়গিরি-সৃষ্ট পাহাড়ের খাড়া ঢাল আর নীল জলরাশি—যা জেজু দ্বীপ (Jeju Island)-কে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু এই সপ্তাহে, মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া কাপলদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই মনোরম দ্বীপটির এক ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। আর তা হল আতঙ্ক ও ভয়ের চিত্র।

জেজু দ্বীপে নিখোঁজ হওয়া চার ব্যক্তির মৃতদেহ তিন দিনের ব্যবধানে উদ্ধার হওয়ার ঘটনায়, এক নিখোঁজ মহিলার সন্ধানের বিষয়টি এখন পুলিশের বড় ধরনের কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে নিখোঁজ সংক্রান্ত মামলাগুলো কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই চারটি মৃত্যুর ঘটনার জেরে নিখোঁজ হওয়া অন্তত ২৯৮টি মামলা এখন নতুন করে পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।


ভারতীয় পর্যটকদের কাছেও জেজু একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য; কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার ‘জেজু ভিসা-ওয়েভার স্কিম’ বা ভিসা-মুক্ত প্রবেশ সুবিধার শর্তসাপেক্ষে, ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা স্বল্পমেয়াদী পর্যটনের জন্য সেখানে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন।

তবে বর্তমানে, মধুচন্দ্রিমা ও আগ্নেয়গিরি-সৃষ্ট প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাবমূর্তির সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। গত ১২ মে জেজু সিটির হাল্লিম-ইউপ এলাকায় নিজের থাকার জায়গা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জাং মি-রান নিখোঁজ হন। পরে তাঁর পরিবার বিষয়টি পুলিশকে জানায়।

সিউল-ভিত্তিক সংবাদপত্র ‘দ্য কোরিয়া হেরাল্ড’-এর তথ্যমতে, ৩৭ বছর বয়সী জাং-এর নিখোঁজ হওয়ার মামলাটি তদন্ত করছিলেন ‘বু’ (Bu) পদবিধারী এক পুলিশ কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে যে, কর্মকর্তা ‘বু’ জাং-এর পরিবারের কাছে মিথ্যা দাবি করেছিলেন যে তিনি জাং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তিনি নিরাপদ আছেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন। অথচ তদন্তকারীরা পরে এমন কোনও কথোপকথনের প্রমাণ পাননি, যার কথা কর্মকর্তা ‘বু’ দাবি করেছিলেন।

সিউল-ভিত্তিক ইংরেজি দৈনিকটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২৪ অগস্ট) হাল্লিম-ইউপের একটি পাম বাগানে জাং-এর বলে ধারণা করা একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়; জায়গাটি তাঁর থাকার স্থান থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দূরে অবস্থিত ছিল।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ স্থানীয় পুলিশের থেকে পাওয়া তথ্য় দিয়ে জানিয়েছে যে, তিন দিনের ব্যবধানে জেজু দ্বীপে নিখোঁজ হওয়া চার ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে জাং-এর মৃতদেহটিও ছিল।

এই কেলেঙ্কারির ঘটনাটি এখন আরও বড় আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ‘বু’-এর হাতে থাকা নিখোঁজ সংক্রান্ত ২৯৮টি মামলা পর্যালোচনা করছে; এর মধ্যে অন্তত ১০টি মামলা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা যখন তল্লাশি অভিযান আরও বিস্তৃত করলেন, তখন দ্বীপটিতে একের পর এক উদ্বেগজনক ঘটনা বা লাশের সন্ধান মিলতে শুরু করল। গত সপ্তাহে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, যিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে আগেই রিপোর্ট করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে যে, সেই একই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর মামলাটিও তড়িঘড়ি করে বা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

মাছ ধরার সময় এক ব্যক্তির নজরে পড়ার পর সত্তরোর্ধ্ব আরেক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চতুর্থ মৃতদেহটি পাওয়া ইয়েছে ‘আওওল-ইউপ’ (Aewol-eup) এলাকার একটি উপত্যকার কাছে। সব মিলিয়ে, সোমবার পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া চার ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘ইয়নহাপ’ (Yonhap) জানিয়েছে, ‘জ্যাং’-এর নিখোঁজ হওয়ার মামলাটি পরিচালনায় গাফিলতির অভিযোগ সামনে আসার পর ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় এই মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। কর্তৃপক্ষ এই মৃত্যুগুলোকে কোনও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেনি এবং পুলিশ বড় কোনও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা ‘ফাউল প্লে’-র (foul play) প্রমাণও এখনও পায়নি।

চারটি মৃত্যু আর ২৯৮টি মামলা এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যুক্ত দু’টি মামলার গণ্ডি পেরিয়ে এই কেলেঙ্কারি এখন আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর তথ্যমতে, ওই পুলিশ কর্মকর্তা ‘বু’ (Bu)-এর হাতে থাকা নিখোঁজ সংক্রান্ত ২৯৮টি মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করছে কর্তৃপক্ষ; এর মধ্যে প্রায় ১০টি মামলা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই বন্ধ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

‘বু’-এর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, জালিয়াতি, দাপ্তরিক ইলেকট্রনিক নথিতে মিথ্যা তথ্য সংযোজন এবং প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ অগস্ট) জেজু-র একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। পুলিশের এই গাফিলতির বিষয়টি এখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে রয়েছে।

জেজু সিওবু (Jeju Seobu) পুলিশ স্টেশনের চারজন কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে—যাদের মধ্যে রয়েছেন স্টেশন প্রধান, প্রাক্তন প্রধান এবং দু’জন সিনিয়র তদন্তকারী। ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সি খতিয়ে দেখছে যে মামলাগুলোর তদারকি বা তত্ত্বাবধান যথাযথভাবে করা হয়েছিল কি না; ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

একজন মহিলার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন পুরো পুলিশি প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে জেজু দ্বীপ কি আদৌ আর নিরাপদ?

দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন ইতিহাসে জেজু দ্বীপ দীর্ঘকাল ধরে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আগ্নেয়গিরি-সৃষ্ট ভূ-প্রকৃতি, সমুদ্রসৈকত, জলপ্রপাত এবং হাইকিং ট্রেইল বা পাহাড়ি পথের কারণে এটি দম্পতি, পরিবার এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

এবং এর জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, দ্বীপটিতে বিদেশি পর্যটকদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের* প্রথম পাঁচ মাসে পর্যটকের সংখ্যা ২১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।কিন্তু একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা এবং নিখোঁজ সংক্রান্ত মামলাগুলো সম্ভবত যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করার বিষয়টি সামনে আসায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মোড় নিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে জেজু দ্বীপের পরিচিতি গড়ে উঠেছিল পর্যটনকে কেন্দ্র করেই—বিমানবন্দরে নবদম্পতিদের আগমন, আগ্নেয়গিরি-সৃষ্ট উপকূলরেখা ধরে যুগলদের হেঁটে চলা এবং দ্বীপের বিখ্যাত সব প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তোলার দৃশ্যই ছিল সেখানকার সাধারণ চিত্র। তবে এই সপ্তাহে সেই পরিচিতি বা আখ্যানটি বদলে গিয়েছে নিখোঁজ সংক্রান্ত প্রতিবেদন, পুলিশের নথিপত্র এবং অমীমাংসিত সব প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে।

ভারতীয় পর্যটকদের স্বল্পমেয়াদী ভ্রমণের জন্য জেজু দ্বীপের বিশেষ ভিসা-মুক্ত ব্যবস্থার আওতায় ভ্রমণকারীদের জন্য দ্বীপটি এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। তবে বর্তমান বিতর্ক এই গন্তব্যটির ভাবমূর্তিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle