শুক্রবার নিউ ইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (9/11) সেই ভয়াবহ হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালন করা হল। তবে এই অনুষ্ঠানটি ঘিরে বিতর্কও দেখা দিয়েছে বিস্তর—যার মূলে ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুপস্থিতি এবং শহরের প্রথম মুসলিম মেয়রের উপস্থিতির বিষয়ে ডানপন্থীদের ক্ষোভ।
এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে, ট্রাম্প নিউ ইয়র্কের মূল অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে পেন্টাগনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্কের সেই অনুষ্ঠানেই স্মরণ করা হয় সেই ঐতিহাসিক ও বিশ্ব-পরিবর্তনকারী দিনটিকে, যেদিন ছিনতাই করা বিমান আছড়ে পড়েছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উপর, ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল টুইন টাওয়ার এবং মোট ২,৯৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছিলেন।
লোয়ার ম্যানহাটনের ‘গ্রাউন্ড জিরো’ এলাকায় সমবেত হয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্পের পূর্বসূরি চারজন জীবিত প্রেসিডেন্ট—হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন, বারাক ওবামা ও বিল ক্লিনটন।
সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের (১২৪০ জিএমটি) পরপরই শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং এতে কোনও বক্তৃতার আয়োজন রাখা হয়নি।
নিহতদের স্বজনরা তাঁদের নাম পাঠ করেন; এ সময় হামলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে চিহ্নিত করতে ঘণ্টা বাজানো হয়—যে হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল।
নিহত টম স্ট্রাডার স্ত্রী টেরি স্ট্রাডা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশটিকে এই হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টদেরও কঠোর সমালোচনা করেন।
বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচারিত এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, “প্রতিটি বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার অভাব আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে; কিন্তু কীভাবে ২৫ বছর পেরিয়ে গেল, অথচ তোমার হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবের ভূমিকার জন্য আমরা এখনও কোনও বিচার পেলাম না?”
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাগুলো মূলত সৌদি বিমান-অপহরণকারীরা চালিয়েছিল, যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ওসামা বিন লাদেন।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্টদের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্র্যাটিক মেয়র জোহরান মামদানি—যিনি ‘বিগ অ্যাপল’-এর (নিউ ইয়র্ক শহরের) প্রথম মুসলিম মেয়র।
এক লাখেরও বেশি স্বাক্ষর-সহ একটি পিটিশনে মামদানির বিরুদ্ধে এমন কিছু ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা “মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবজ্ঞাশীল অথবা চরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সমালোচনামুখর নন।” সিটি কাউন্সিলের সদস্য শাহানা হানিফ সিএনএন-কে বলেন, “মেয়রের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে—শুধুমাত্র তিনি একজন মুসলিম—বিষয়টি আমার কাছে উদ্বেগজনক।”
লোয়ার ম্যানহাটনে হামলার পর সেখানকার হাওয়ায় বিষাক্ততার মাত্রা সম্পর্কে নগর কর্মকর্তারা কী জানতেন, তা প্রকাশকারী হাজার হাজার নথিপত্র সম্প্রতি সামনে আনার জন্য মামদানি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধসে পড়ার পর সৃষ্ট প্রাথমিক ধূলিকুণ্ডলীর রেশ কাটতে না কাটতেই দীর্ঘ সময় ধরে দূষণ ও ধূলিকণার প্রকোপ অব্যাহত ছিল; এর ফলে সৃষ্ট ক্যান্সারে আজও হাজার হাজার নিউ ইয়র্কবাসী ভুগছেন।
এই ২৫ বছরের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখা পুরো বিশ্বকে রীতিমতো স্তম্ভিত করে দেওয়া আক্রমণকে-
২০০১ সালের শরৎকালের এক মেঘমুক্ত দিনে আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করেছিল। এর মধ্যে দু’টি বিমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ‘টুইন টাওয়ার’-এ আঘাত হানে, যার ফলে ১১০ তলা বিশিষ্ট সেই আইকনিক ভবন দু’টি ধসে পড়ে।
তৃতীয় বিমানটি পেন্টাগনে আঘাত করে। আর চতুর্থ বিমানটি—যা সম্ভবত কংগ্রেস ভবন বা হোয়াইট হাউসকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল—যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে ভেঙে পড়ে।
১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় সরাসরি নিহতদের বাইরেও, ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য গঠিত ফেডারেল কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ৯/১১-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অসুস্থতায় আরও ৯,৪০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর প্রায় ১০ কোটি আমেরিকানের জন্ম হয়েছে অথবা তারা বয়সে এতই ছোট যে তাদের সেই দিনের কথা মনে নেই।
‘ইঞ্জিন ৫৪, ল্যাডার ৪, ব্যাটালিয়ন ৯’-এর অবসরপ্রাপ্ত দমকলকর্মী জন ফিলা জানান, ৯/১১-এর ঘটনায় তাদের ফায়ারহাউসের ১৫ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “প্রতি বছর এই সময়টা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এটা সত্যিই অসাধারণ যে এত মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করতে ফিরে আসেন। আমাদের ফায়ারহাউসে সেই ১৫ জন সদস্যের ছবি রয়েছে। (নতুন দমকলকর্মীরা) সেগুলো দেখেন ঠিকই, কিন্তু সেই দমকলকর্মীদের জীবন এবং সেদিন তারা কী করছিলেন—সেসব তুলে ধরা বা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব আমাদেরই।” ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে ওই ফায়ারহাউসে কর্মরত সর্বশেষ দমকলকর্মী ছিলেন ফিলা।
মুহূর্তের মধ্যে একটা স্বাভাবিক দিন (9/11) কী ভাবে ভয়ঙ্কর এক ইতিহাসের খাতায় লেখা হয়ে গেল। কত মানুষ কিছু বোঝার আগেই প্রাণ হারালেন। কেউ কেউ স্বয়ং মৃত্যুকে সামনে থেকে উপলব্ধি করলেন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই মরণ ঝাঁপ দিলেন। মৃত্যু তখন দু’দিকেই দু’বাহু বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ২৫ বছর। তাও সেই স্মৃতিতে একটুও ধুলো পড়েনি। যাঁরা প্রিয় মানুষদের হারালেন তাঁরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই বোঝা। আর তার মধ্যেই প্রতিবছর সব স্মৃতিকে নতুন করে উস্কে দিতে হাজির হয় এই দিন।
এদিকে, আল-কায়েদা এই বার্ষিকী উপলক্ষে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে প্রয়াত নেতা ওসামা বিন লাদেন এবং তাঁর ছেলে হামজার ছবি দেখানো হয়েছে; উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে হামজাও নিহত হয়েছেন।
স্মরণসভার প্রাক্কালে নিউ ইয়র্ক হারবারের আকাশে ২,৯৭৭টি আলোর বিন্দু দিয়ে একটি ড্রোন প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়—হামলায় নিহত প্রতি ব্যক্তির স্মরণে একটি করে আলো জ্বালানো হয়েছিল। তবে এখন যতোই আলো জ্বলুক, যে অন্ধকার নেমেছিল ২৫ বছর আগে তা ক্রমশ গ্ৰাস করছে পুরো পৃথিবীকে। বিশ্ব জুড়ে একাধিক যুদ্ধ যেন তারই প্রমাণ।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
