ট্রেনে দীর্ঘ সফরের সময় মোবাইলে গান শোনা, সিনেমা দেখা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও দেখার অভ্যাস এখন খুবই সাধারণ। কিন্তু সেই গান বা ভিডিও যদি হেডফোন ছাড়া উচ্চস্বরে চালানো (Phone On Speaker) হয় এবং তাতে সহযাত্রীদের অসুবিধা তৈরি হয়, তাহলে বিপাকে পড়তে পারেন আপনিও। রেলযাত্রায় নিজের বিনোদনের অধিকার থাকলেও অন্য যাত্রীদের শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করার অধিকার কারও নেই।
বিশেষ করে রাতের ট্রেনে এই ধরনের ঘটনা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অভিযোগ বাড়ছে। কেউ ঘুমোচ্ছেন, কেউ অসুস্থ, আবার কেউ পরদিন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছেন। তার মধ্যে পাশের সিট থেকে একটানা মোবাইলের আওয়াজ, গান বা ভিডিওর শব্দ ভেসে এলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
জোরে গান বাজানো নিয়ে কী বলছে রেলের নিয়ম?
রেলযাত্রায় এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয়, যার ফলে সহযাত্রীদের অযথা বিরক্তি বা অসুবিধা হয়। ভারতীয় রেলের যাত্রী-আচরণ সংক্রান্ত নির্দেশনায়ও সহযাত্রীদের অসুবিধা সৃষ্টি করে এমন শব্দ বা আচরণ এড়িয়ে চলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, ট্রেনে মোবাইলে গান বা ভিডিও দেখতে হলে হেডফোন ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। স্পিকারে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে পুরো কামরাকে তা শোনানো কোনওভাবেই দায়িত্বশীল যাত্রীর আচরণ নয়।
সরাসরি জেল হবে?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় দাবি করা হয়, ট্রেনে জোরে গান বাজালেই সরাসরি জেলে যেতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
শুধু মোবাইলে গান চালানোর কারণে প্রত্যেক যাত্রীর ক্ষেত্রে একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে—এমনটা বলা যায় না। ঘটনার পরিস্থিতি, যাত্রীর আচরণ এবং কোন আইন বা রেলওয়ে বিধি লঙ্ঘন হয়েছে, তার উপর ব্যবস্থা নির্ভর করবে।
তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সহযাত্রীদের বিরক্ত করেন, সতর্ক করার পরেও আচরণ বন্ধ না করেন কিংবা পরিস্থিতি গুরুতর করে তোলেন, তাহলে রেল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা বড়ও হতে পারে।
অভিযোগ করলে কী হতে পারে?
কোনও যাত্রী যদি মনে করেন পাশের কেউ অতিরিক্ত শব্দ করে তাঁকে বা অন্য যাত্রীদের বিরক্ত করছেন, তাহলে প্রথমে তাঁকে ভদ্রভাবে শব্দ কমাতে বলা যেতে পারে। তাতে কাজ না হলে ট্রেনে থাকা রেলকর্মী, টিকিট পরীক্ষক বা রেল সুরক্ষা ব্যবস্থার কর্মীদের বিষয়টি জানানো যায়।
রেলযাত্রীরা প্রয়োজন হলে রেলের অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমেও বিষয়টি জানাতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী রেলকর্মীরা সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে সতর্ক করতে বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
রাতের ট্রেনে বাড়তি সতর্কতা
রাতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দূরপাল্লার ট্রেনে নির্দিষ্ট সময়ের পর অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েন। সেই সময়ে জোরে গান, সিনেমা, রিল বা ফোনে কথাবার্তা অন্য যাত্রীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তাই রাতের যাত্রায় মোবাইল ব্যবহার করার সময় হেডফোন ব্যবহার করা এবং ভলিউম যথাসম্ভব কম রাখা উচিত।
শুধু গান নয়, ফোনে জোরে কথা বলাও সমস্যা
সমস্যাটি কেবল গান বা ভিডিওর ক্ষেত্রে নয়। দীর্ঘক্ষণ উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলা, ভিডিও কল করা, একাধিক যাত্রীর মধ্যে জোরে আলোচনা করা কিংবা কোচে অপ্রয়োজনীয় শব্দ করাও সহযাত্রীদের বিরক্তির কারণ হতে পারে।
রেল কামরা কোনও ব্যক্তিগত ঘর নয়। একই জায়গায় বিভিন্ন বয়সের এবং বিভিন্ন প্রয়োজনের মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকেই কিছুটা সামাজিক দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত।
কীভাবে নিরাপদে মোবাইল ব্যবহার করবেন?
ট্রেনে গান, সিনেমা বা ভিডিও দেখার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই সমস্যা এড়ানো সম্ভব—
১. হেডফোন ব্যবহার করুন।
স্পিকারে গান বা ভিডিও চালানো এড়িয়ে চলুন।
২. ভলিউম কম রাখুন।
হেডফোন ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত শব্দ যেন বাইরে না আসে।
৩. রাতে বিশেষ সতর্ক থাকুন।
সহযাত্রীরা ঘুমিয়ে থাকলে মোবাইলের শব্দ একেবারেই কমিয়ে দিন।
৪. আপত্তি জানালে সম্মান করুন।
কেউ অসুবিধার কথা জানালে তর্ক না করে শব্দ বন্ধ বা কম করুন।
৫. প্রয়োজন হলে রেলকর্মীকে জানান।
অন্য কোনও যাত্রী বারবার বিরক্ত করলে নিজের মধ্যে ঝামেলায় না গিয়ে কর্তব্যরত রেলকর্মীর সাহায্য নিন।
যাত্রীদের জন্য বার্তা
ট্রেনে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন সফরের সময় নিজের বিনোদনের পাশাপাশি অন্য যাত্রীদের কথাও ভাবা জরুরি। একটি হেডফোন ব্যবহার করলেই যেমন নিজের গান বা ভিডিও উপভোগ করা যায়, তেমনই আশপাশের মানুষও শান্তিতে যাত্রা করতে পারেন।
তাই ট্রেনে জোরে গান বা ভিডিও চালিয়ে ‘মজা’ করার আগে একবার ভাবুন—আপনার বিনোদন যেন অন্য কারও রাতের ঘুম বা পুরো যাত্রাটাই নষ্ট না করে। নিয়ম মেনে এবং সহযাত্রীদের প্রতি সম্মান দেখিয়েই রেলযাত্রা করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পথ।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
