দুর্গাপুজো শেষ। কয়েকদিনের টানা খাওয়াদাওয়া, রাত জাগা, অনিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং শরীরচর্চার অভ্যাসে ছেদ পড়ার পর এবার অনেকেই ফিরতে চাইছেন স্বাভাবিক রুটিনে। পুজোর সময়ে একটু বেশি খেয়ে ফেলেছেন বলে চিন্তার কারণ নেই। তবে উৎসবের পর শরীরকে আবার ভারসাম্যে ফেরাতে চাইলে প্রয়োজন নিয়মিত খাবার (Balanced Food), পর্যাপ্ত জল, ঘুম এবং হালকা শরীরচর্চা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পুজোর পর হঠাৎ না খেয়ে থাকা বা ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ শুরু করা ঠিক নয়। কয়েকদিনের অতিরিক্ত খাওয়ার পর শরীরকে সময় দিয়ে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর রুটিনে ফিরিয়ে আনাই বেশি কার্যকর।
সকাল শুরু হোক জল দিয়ে
ঘুম থেকে ওঠার পর এক থেকে দুই গ্লাস জল দিয়ে দিন শুরু করা যেতে পারে। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সারা দিনে পর্যাপ্ত জল পান করুন। তবে শুধুমাত্র ‘ডিটক্স ওয়াটার’, জুস বা কোনও বিশেষ পানীয় খেলেই শরীর থেকে সব ‘টক্সিন’ বেরিয়ে যাবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
চা বা কফি খেলে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন।
ব্রেকফাস্ট বাদ দেবেন না
পুজোর পর ওজন কমানোর জন্য অনেকে সকালের খাবার বাদ দিতে চান। এটি না করে পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট বেছে নেওয়া ভালো।
ব্রেকফাস্টে থাকতে পারে—
- ওটস বা দুধ সঙ্গে কথা বা অন্য কোনও ফল
- ডিম সেদ্ধ
- আটার রুটি
- সবজি দিয়ে উপমা বা পোহা
- দইয়ের সঙ্গে ফল ও অল্প বাদাম
- সবজি ও ডাল দিয়ে তৈরি হালকা খাবার
ব্রেকফাস্টে অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাভুজি ও প্যাকেটজাত খাবার যতটা সম্ভব কম রাখুন।
দুপুরের খাবারে ফিরুন ব্যালান্সড প্লেটে
দুপুরের খাবারে ভাত একেবারে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও প্রোটিন রাখুন।
একটি সহজ প্লেটে থাকতে পারে—
অর্ধেক: সবজি বা সালাদ
এক-চতুর্থাংশ: ভাত/রুটি
এক-চতুর্থাংশ: মাছ, ডিম, ডাল, চিকেন বা অন্য কোনও প্রোটিনের উৎস
বাঙালি খাবারের মধ্যে মাছ, ডাল, শাকসবজি সহজেই এই ব্যালান্স তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। তবে অতিরিক্ত তেল, ঘি, মাখন ও ভাজা খাবার কমানো জরুরি।
বিকেলের খিদে সামলাবেন কীভাবে?
পুজোর পরে বিকেলের চা-এর সঙ্গে সিঙ্গারা, চপ, মিষ্টি বা বিস্কুটের অভ্যাস কয়েকদিনের জন্য বদলে ফেলতে পারেন।
বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে পারেন—
- একটি গোটা ফল
- অল্প বাদাম
- ভাজা ছোলা
- দই
- সেদ্ধ ডিম
- চিনি ছাড়া বা কম চিনি দিয়ে চা
এতে অকারণে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমবে এবং রাতের খাবারের আগে অতিরিক্ত খিদেও পাবে না।
রাতে খাবার হোক হালকা
রাতের খাবার খুব দেরি করে না খাওয়াই ভালো। খাবারের পরিমাণও দুপুরের তুলনায় কিছুটা কম রাখা যেতে পারে।
রাতে থাকতে পারে—
- রুটি ও সবজি
- ডাল ও সবজি
- গ্রিল/কম তেলে রান্না করা মাছ বা চিকেন
- স্যুপ
তবে শুধুমাত্র স্যালাড খেয়ে রাত কাটানো বা দিনের পর দিন ডিনার বাদ দেওয়া সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
মিষ্টি ও ভাজাভুজি কি পুরোপুরি বন্ধ?
না। পুজোর পর স্বাস্থ্যকর রুটিন মানেই চিরতরে মিষ্টি বা পছন্দের খাবার বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং পরিমাণ ও ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করা বেশি বাস্তবসম্মত।
পুজোয় কয়েকদিন বেশি মিষ্টি খেয়ে থাকলে পরের কয়েকদিন নিয়মিত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটা কমিয়ে দিন। একইভাবে ভাজাভুজি, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো যেতে পারে।
শরীরচর্চায় ধীরে ফিরুন
পুজোর সময়ে যদি হাঁটা বা ব্যায়াম বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে প্রথম দিন থেকেই কঠিন ওয়ার্কআউট শুরু করার প্রয়োজন নেই।
প্রথমে ২০-৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। শরীর অভ্যস্ত হলে ধীরে ধীরে সময় ও ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো যায়।
নিয়মিত হাঁটা, স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম বা নিজের উপযোগী অন্য কোনও শারীরিক কার্যকলাপ রুটিনে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
ঘুমও ডায়েটের অংশ
পুজোর সময়ে রাত জাগা, দেরিতে ঘুম এবং সকালে দেরি করে ওঠার কারণে ঘুমের রুটিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই উৎসবের পর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাসে ফিরে আসা জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুম খিদে ও খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করতে পারে।
পুরো একটা ২৪ ঘণ্টা আপনার খাদ্য তালিকা কেমন হতে পারে-
সকাল: জল + পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট
মাঝে: একটি ফল
দুপুর: পরিমিত ভাত/রুটি + ডাল + সবজি + মাছ/ডিম/চিকেন
বিকেল: চা/কফি + বাদাম/ভাজা ছোলা/ফল
রাত: রুটি/অল্প ভাত + সবজি + প্রোটিন
সারা দিন: পর্যাপ্ত জল
এই তালিকা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির চিকিৎসা বা ওজন কমানোর প্রেসক্রিপশন নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, দৈনন্দিন কাজের ধরন এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাবারের প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।
‘ডিটক্স’ নয়, দরকার নিয়মে ফেরা
পুজোর পর শরীরকে ব্যালান্সে ফেরানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হল কোনও ম্যাজিক ডায়েট নয়। কয়েকদিন বেশি খাওয়ার পর আতঙ্কিত না হয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবারের রুটিনে ফিরে আসাই মূল কথা।
পরিমিত খাবার, বেশি সবজি ও ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন, কম ভাজাভুজি ও অতিরিক্ত চিনি, পর্যাপ্ত জল, নিয়মিত হাঁটা এবং ভালো ঘুম—এই কয়েকটি অভ্যাসই পুজোর পর শরীরকে আবার ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে।
আর যদি দীর্ঘদিনের কোনও স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, গর্ভাবস্থা, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, ডায়াবেটিস, বা বিশেষ কোনও ওষুধ চলতে থাকে, তাহলে নিজের মতো করে কঠোর ডায়েট শুরু না করে চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
