বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে চলতে থাকে আরও একগুচ্ছ জিনিস। ট্রেন টিকিট, প্যাকিং, হোটেল বুকিং, সাইট সিনষ শপিং—আরও অনেক কিছু। কিন্তু ট্রেনের টিকিট বুকিংয়ের পাশাপাশি সবার আগে যেটা তালিকায় যুক্ত হয়ে যাওয়া সেটা হল যাত্রা পথের খাবার-দাবার। একটা সময় ছিল, যখন বিছানা থেকে খাবার সবই পোটলা বেঁধে নিয়ে ট্রেনে উঠতে হত। কারণ দীর্ঘ যাত্রায় রাস্তায় তেমনভাবে একটা সময় পর্যন্ত কোনও খাবার পাওয়া যেত না। অগত্যা বাড়িতে জমিয়ে টিফিন বক্স ভরে খাবার নিয়েই বেরতে হতো। মেনুর পরিকল্পনাও ছিল একটা বড় কাজ। ট্রেন (Indian Rail) যাত্রায় তো সব ধরনের খাবার নিয়ে গেলে খেতে অসুবিধে, সে কারণে কী নেওয়া হবে তার জন্য রান্না, প্যাকিং ইত্যাদি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। সহজ হয়েছে যাতায়াত। অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে যাত্রা পথের খাবার পাওয়াও। চলে এসেছে ট্রেনের প্যান্ট্রিকার।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই সব নিয়ে আর ভাবতে হয় না। রেল ভ্রমণে দীর্ঘ ডিজিটাল মেনু, কিউআর কোড, ব্র্যান্ডেড জলের বোতল এবং আঞ্চলিক থালি থেকে শুরু করে ফাস্ট ফুড পর্যন্ত বিভিন্ন ধরণের খাবার এখন যাত্রা পথে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু তার পরও ট্রেনের ফুড মেনুতে বিপুল বদল এসেছে। আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে নিয়মিত ট্রেন ভ্রমণ করতাম তাদের ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতায় যেমন রয়েছে বাড়ি থেকে বেডিং কাঁধে যাত্রা করা তেমনই রয়েছে সিটে সিটে পৌঁছে যাওয়া খাবারের থালা, জলের বোতল। মনে পড়ছে, একটা সময় নিজেদের জলের বোতল স্টেশনের ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের কল থেকে ভরে আনতেন বাবা বা পরিবারের পুরুষরা।
সময় বদলেছে, হাতের মুঠোয় চলে এসেছে সবটা। তবে ঐতিহ্যের দিনগুলো অন্যরকমই ছিল। আসল গল্পটা সেই সময়ের যখন ট্রেনের প্যান্ট্রিকারে সুস্বাদু সব খাওয়ার বিকল্প থাকত। সময়টা ৯০-এর দশক। ১৯৯০-এ প্রথম ভারতীয় রেলে তৈরি হল মেনু। সেই সময় ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন (IRCTC) গঠনের বহু বছর আগে, জোনাল রেলওয়ে, প্যান্ট্রি কার, স্টেশন রিফ্রেশমেন্ট রুম এবং ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের দ্বারা খাবার পরিষেবা পরিচালিত হত। পুরোটা মেনু রুট, প্যান্ট্রি কর্মী এবং বোর্ডে উপলব্ধ সুযোগ-সুবিধার উপর নির্ভর করত।
খাবার স্টিলের ট্রে বা মেলামাইন প্লেটে আসত। চা ঘন কাচের গ্লাসে আসত। কিছু স্টেশনে, বিক্রেতার আগেই ভাজা কাটলেটের গন্ধ কোচে প্রবেশ করত। এই সব মুহূর্তগুলো ভারতীয় ট্রেন ভ্রমণের একটা সময়কে চিহ্নিত করে। ব্রেকফাস্ট থেকে ডিনার, সবেতেই ছিল নানা বিকল্প। ট্রেনের দুলুনি, জানলার বাইরে বদলাতে থাকা প্রকৃতি, বদলে যাওয়া এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যের সীমানা সঙ্গে খাবারের স্বাদও।
সেই নিরামিষ খাবার রেলওয়ের মেনুর মেরুদণ্ড ছিল। একটি স্ট্যান্ডার্ড নিরামিষ থালিতে থাকত ভাত বা রুটি, সাধারণ হলুদ ডাল, একটি সবজি, আলু-গোবি, বাঁধাকপি, বিনস বা মিক্স ভেজ। সঙ্গে এক চামচ আচার। গরম গরম খোপকাটা স্টিলের থালায় তখন যেন চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে দৌড়চ্ছে সুস্বাদু খাবার।
এছাড়া ভেজ পোলাও বা খিচুড়িও পাওয়া যেত, বিশেষ করে রাতের যাত্রায়। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে সকালের নাস্তা পরিবেশন করা হত। উত্তর রুটে, দই দিয়ে আলু পরোটা দেখা যেত। দক্ষিণে ইডলি, পোঙ্গাল, অথবা উপমা। জোন জুড়ে পাউরুটি এবং মাখন ছিল নিয়মিত প্যান্ট্রির প্রধান খাবার।
এখানেই শেষ নয়, স্টেশনের মধ্যে বিক্রেতারা কাগজে মোড়ানো সিঙ্গারা বা সামোসা, কচুরি, কাটলেট এবং স্যান্ডউইচ নিয়ে ট্রেনে উঠত, যা খাদ্যরসিকদের জন্য ছিল বাড়তি পাওনা। ছোট স্টেশনগুলোতে সংক্ষিপ্ত বিরতির সময় কোচের জানালা দিয়ে চা, পকোড়া চালান হয়ে যেত ট্রেনের ভিতরে। ট্রেন ছাড়তে ছাড়তেই জিনিস আর টাকার আদান-প্রদান হয়ে যেত সহজেই।
আমিষ খাবারের বিকল্পও ছিল, যদিও সেগুলো কিছুটা কম। ব্রেকফাস্টে অমলেট স্বাভাবিক ছিল। দীর্ঘ রুটে ভাত বা রুটি দিয়ে এগকারি দেওয়া হত। যেখানে স্টোরেজের অনুমতি ছিল সেখানে চিকেনকারিও পাওয়া যেত।
কিছু কিছু ট্রেনে, চিকেন বিরিয়ানিও পাওয়া যেত। সাধারণ কোচের চেয়ে স্টেশনের রিফ্রেশমেন্ট রুমে মটনের বিকল্প বেশি পাওয়া যেত। প্যান্ট্রি কার ছাড়া ট্রেনগুলিতে, যাত্রীরা বড় জংশনে প্ল্যাটফর্ম বিক্রেতাদের উপর অনেক বেশি নির্ভর করতেন। ক্যানে করে বিক্রি হতো সেই অঞ্চলের বিশেষ কোনও বিখ্যাত মিষ্টি, বক্সে করে সোন পাপড়ি, টিনে রাখা গুলাব জামুন। কাগজে মোড়ানো বেসনের লাড্ডু। বার্থের মধ্যে দিয়ে যাওয়া হতো ক্রিম বিস্কুট এবং গ্লুকোজ বিস্কুটের প্যাকেট। হকাররা স্টেশনে স্টেশনে কলা এবং কমলালেবু বিক্রি করত।
পানীয় জলের ক্ষেত্রেও গল্পটা ভিন্ন ছিল। বোতলজাত জল বেশিরভাগ বড় স্টেশনগুলিতে পাওয়া যেত, সাধারণত ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের। একটি দেশব্যাপী রেলওয়ে ব্র্যান্ড রেল নির তখনও বাস্তবের আলো দেখেনি। অনেক যাত্রী ধাতব ফ্লাস্ক বহন করতেন। কেউ কেউ স্টেশনের ট্যাপে রিফিল করা বোতল বহন করতেন।
১৯৯০-এর দশকের রেলওয়ে মেনুতে অনেক বিকল্প না থাকলেও, বিকল্প ছিল। বর্তমান সময়ের মতো নয়, যে যা দেবে তাই খেতে হবে। আপনার স্বাদের জন্য কোনও বিকল্প নেই। এবং বড্ড একঘেয়ে, বিস্বাদ, বিকল্পহীন মেনু এখন ভারতীয় রেলের খাবার। নতুন নতুন, হাইস্পিড, বিখ্যাত সব ট্রেনের বোধন হচ্ছে এদেশে প্রায় প্রতিদিনই। কিন্তু খাবার বিকল্পে কোনও উন্নতি হচ্ছে না। ট্রেন যাই হোক না কেন, খেতে হবে রেলের বেছে দেওয়া সেই মেনুই। এক্ষেত্রে মনে হয়, ভারতীয় রেল যদি কিছুটা ৯০-এর দশকে ফিরে যেত তাহলে ভালো হত।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
