Pahalgam Attack-এর এক বছর পর কেমন আছে বৈসরণ ভ্যালি ও তার সারথীরা

Pahalgam Attack

পহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় (Pahalgam Attack) ২৬ জনের প্রাণহানির এক বছর পরেও, ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত বিখ্যাত বৈসরণ ভ্যালি এখনও ট্যুরিস্ট শূন্য। একসময়ের সবুজ শ্যামল প্রান্তর এখন পর্যটকদের কোলাহলের পরিবর্তে নিস্তব্ধতায় মুখরিত, আর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও টাট্টু ঘোড়ার চালকেরা জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। পহেলগামের কিছু অংশে সতর্কতার সঙ্গে অল্প অল্প করে পর্যটকদের আগমন ঘটলেও, বৈসরণের এই ক্রমাগত বন্ধ থাকা অঞ্চলটির পর্যটন-নির্ভর জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ঘোড়ার চালকেরা, যারা একসময় এই মনোরম পথ ধরে পর্যটকদের বৈসরণ ভ্যালিতে নিয়ে যেত। এখন গেলে দেখা যাবে সারি সারি টাট্টু ঘোড়া অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে; তাদের চালকেরা, যারা স্থানীয়ভাবে ‘পনিওয়ালা’ নামে পরিচিত, এমন গ্রাহকদের জন্য অপেক্ষা করছেন যারা আর আসেন না।


একবছর আগে এই বৈসরণ ভ্যালিতে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছিল ২৬ জন সাধারণ মানুষের। যাঁদের জীবন থেকে প্রিয় মানুষ চলে গেল, তাদের যন্ত্রণা বাইরে বসে বোঝা সম্ভব নয়। তাদের সারাজীবনের ক্ষত দিয়ে গিয়েছে এই ঘটনা। তবে তাদের সঙ্গে খারাপ হয়ে গিয়েছে আরও কিছু‌ মানুষের জীবন। পাহেলগামের প্রায় ৫,০০০-৬,০০০ টাট্টু ঘোড়ার চালকের জন্য বৈসরণ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র ছিল না। এটি ছিল তাদের জীবিকার মেরুদণ্ড। কাশ্মীর ভ্রমণের এটি ছিল একটি অন্যতম গন্তব্য। যেখানে পর্যটকরা ঘোড়ায় চড়ে এই মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে করতে সেখানে পৌঁছে যাওয়া। সেই আনন্দ আজ উধাও। আর তার সঙ্গে সঙ্গে উধাও হাজার হাজার মানুষের জীবিকা।

সেখানকার ঘোরার চালকরা বলছেম, ‘‘আমরা ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। এমন পতন পরিস্থিতি আগে কখনও দেখিনি। আগে আমরা দিনে একাধিকবার যাতায়াত করতাম। এখন, একবার চড়াটাও বিরল।” অতীতে এই কাশ্মীর রাজ্যের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছে। এখানকার মানুষরা জানেন, কী কী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে তাদের। তবে এই পরিস্থিতির সঙ্গে আর তারা মানিয়ে নিতে পারছেন না।

অনেকে বলেন, গত বছরটা ছিল টিকে থাকার লড়াই, আয়ের নয়। বিকল্প কোনও জীবিকা না থাকায় এবং ন্যূনতম সহায়তা পাওয়ায় পরিবারগুলো একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময়ের পরিচিত ঘোড়ার খুরের শব্দ আর পর্যটকদের কথাবার্তার বদলে এখন নেমে এসেছে এক অস্বস্তিকর নীরবতা আর দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা।

একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে হোটেল, রেস্তোরাও। পহেলগাম হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি জাভেদ বুর্জার মতে, পর্যটন খাতে মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ হোটেল পূর্ণ থাকছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান এড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। বুর্জা বলেন, “পর্যটকরা এলেও রাত কাটান না। তাঁরা সকালে আসেন এবং সন্ধ্যার মধ্যে চলে যান। রাতের বেলায় হোটেল পূর্ণ থাকার হার মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে, আর আসল আয়টা তো সেখানেই।”

যেসব হোটেল একসময় বসন্তের ভরা মরসুমে পুরোপুরি বুকড থাকত, সেগুলো এখন খালি ঘর নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রেস্তোরাঁগুলোতে খদ্দেরের আনাগোনা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে, অন্যদিকে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান হয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা কোনও মতে টিকে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। অন্যগুলো খোলা থাকলেও কয়েক মাস ধরে কোনও অতিথি পায়নি।”

পহেলগামের বাজারগুলোতে শাল, হস্তশিল্প এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানদাররা, যারা একসময় পর্যটকদের খরচে সচ্ছল ছিলেন, এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অলস বসে আছেন। “পর্যটনই আমাদের মেরুদণ্ড। এটা বন্ধ হয়ে গেলে সবকিছুই থেমে যায়,” বললেন এক স্থানীয় ব্যবসায়ী। “যারা সম্প্রতি বিনিয়োগ করেছেন, তারাও সমস্যায় পড়েছেন। হোটেল বা দোকানে চাকরি পাওয়া অনেক তরুণ এখন বেকার।”

এর প্রভাব সব খাতেই দৃশ্যমান; ট্যাক্সি চালক, গাইড এবং বিক্রেতা—সকলেই ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

পহেলগামের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পর্যটন কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা নয়, বরং পর্যটকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। যদিও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, অনেকেই মনে করেন নিরাপত্তা এবং সহজগম্যতার মধ্যে ভারসাম্য এখনও অর্জিত হয়নি। বৈসরণ-সহ বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ বা আংশিকভাবে খোলা রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় অবস্থানকে আরও নিরুৎসাহিত করছে।

এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা-সহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলো পুনরায় খোলার জন্য অনুরোধ করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়।

ঐতিহ্যগতভাবে বসন্ত পহেলগামের সবচেয়ে ব্যস্ততম মরসুম। কিন্তু এ বছর তা ব্যর্থ হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন এপ্রিল ও মে মাস মানেই ছিল ঠাসা হোটেল, জমজমাট বাজার আর বৈসরণের অবিরাম টাট্টু ঘোড়ায় চড়া। আজ, এমনকি ব্যস্ততম সময়েও, শহরটিকে নিষ্প্রভ মনে হয়। “গত বছর দাঁড়ানোরও জায়গা ছিল না,” স্মৃতিচারণ করলেন এক হোটেল কর্মী। “এ বছর পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে।”

এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, সহনশীলতা এবং আশা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বৈসরণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলো পুনরায় খোলার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও জোরালো বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। নিরাপত্তা এবং আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ধারাবাহিক প্রচারমূলক প্রচেষ্টা চলছে। “পর্যটন আবারও ফিরে আসবে,” বললেন স্থানীয় এক হোটেল কর্মী। “তবে এর জন্য কিছুটা সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত আমরা কেবল আশা করতে পারি—আর টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে পারি।”

আপাতত, পহেলগাম অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এখানকার মানুষ এখন স্মৃতি আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার দোলাচলে দোদুল্যমান; এখানকার অর্থনীতি অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আটকে পড়ে স্থবির হয়ে আছে; আর এখানকার সবচেয়ে সুপরিচিত ও নয়নাভিরাম ভ্যালিটি এখনও রয়ে গিয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার