আরও একটা 21 July Martyr’s Day, ফিরে দেখা যাক ৩৩ বছর আগের সেই দিন

21 July Martyr's Dayছবি— সংগৃহিত

বিশেষ প্রতিবেদন: সালটা ১৯৯৩। দিন ২১ জুলাই (21 July Martyr’s Day)। সকাল থেকে সেদিনও ছিল আকাশের মুখ ভার। ধিকি ধিকি জ্বলছিল আগুনটাও। নেপথ্যেই এই শহর প্রস্তুতি নিচ্ছিল অন্য এক আন্দোলনের। নির্বাচনে বাধ্যতামূলক ছবি-সহ ভোটার পরিচয়পত্র চালুর দাবিতে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং অভিমুখে একটি প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করেছিলেন তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আই)-এর একজন নেত্রী। তখন বাংলায় বাম শাসন। সেই মিছিলেই ঘটে যায় ভয়ঙ্কর এক ঘটনা। মিছিল আটকাতে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন প্রতিবাদীর প্রাণ যায়। যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রাথমিকভাবে আন্দোলন কংগ্রেসের হলেও পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হলে এই দিনের দখল নেয় তারা। ‘শহিদ দিবস’ একটি বার্ষিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়। যা প্রতি বছর ২১ জুলাই কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস দ্বারা পালিত হয়। তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা শাসনকালে এই দিন অনেক বড় আকাড়েই পালিত হয়ে এসেছে। আজ সে দিন। তবে ২০২৬-এর এই দিন অনেকটাই আ‌লাদা। বাংলায় এখন বিজেপি শাসন আর তার মধ্যেই পালিত হল এই ‘শহিদ দিবস’। তবে আমরা বর্তমান নয়, ফিরে দেখব ৩৩ বছর আগের সেই দিনকে।

সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পি. ভি. নরসিমহা রাও সরকারে মানবসম্পদ উন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে ১৯৯২ সালে পশ্চিমবঙ্গের যুব কংগ্রেসের সভাপতি পদের নির্বাচনে সোমেন মিত্রের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে তাঁর প্রভাব হ্রাস পেয়েছিল। পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোমেন মিত্রের গোষ্ঠী এবং কংগ্রেস হাইকমান্ডের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকে এর জন্য দায়ী করেছিলেন। রাজনৈতিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে, তিনি ছবি-সহ ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক সদর দফতর ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ অভিমুখে একটি মিছিলের ডাক দেন।


১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই, হাজার হাজার কংগ্রেস কর্মী মধ্য কলকাতায় সমবেত হন; তাঁদের উপস্থিতি বৌবাজার থেকে ব্র্যাবোর্ন রোড এবং মেয়ো রোড থেকে স্ট্র্যান্ড রোড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শহরের বিশাল অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সমাবেশে কংগ্রেসের যুব নেতারা—যাদের মধ্যে মৃগেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্য বাপুলি অন্যতম—উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ দিয়ে জনতাকে আরও চাগিয়ে দেন। তাঁরা পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘‘আমরা এখানে লড়াই করতে এসেছি, নাটক করতে নয়।’’

রেড রোডে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে তালতলা থানার সার্জেন্ট ডি. কে. ঘোষাল গুলিবিদ্ধ হন, এসআই কালাচাঁদ সমাদ্দারের মাথা লোহার রডের আঘাতে ফেটে যায় এবং ইটের আঘাতে কনস্টেবল মানস নন্দীর ছয়টি দাঁত ভেঙে যায়। পিটিআই-এর সাংবাদিক সঈদ আহমেদ গুরুতর আহত হন। মেয়ো রোডে হামলাকারীদের কাছ থেকে পুলিশ দু’টি ভর্তি পাইপগান, একটি দেশি রিভলবার, ১৭টি বোমা এবং ছয়টি তলোয়ার উদ্ধার করে। ১৪৪ ধারা অমান্য করে জনতা এমনকি প্রেস ক্লাবের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। নিউ মার্কেটে লুটপাট চালানো হয়, ক্লাবের তাঁবুতে হামলা হয় এবং এসএসকেএম হাসপাতালকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তিনটি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ৩৫টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং ২১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।

সেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। এতে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব না হওয়ায় নিয়ম মেনে তারা সতর্কতাস্বরূপ আকাশে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। তবে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে পুলিশ দাঙ্গাকারীদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে ১৩ জন নিহত হন। এই ঘটনাটি আন্দোলনের মোড়কে এক মর্মান্তিক দিকে নিয়ে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, গোলাগুলির সময় পুলিশের গাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে তিনি হাসপাতালে গিয়ে আহত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করেন। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ও সাধন পাণ্ডের মতো কংগ্রেসের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও বিধানসভা ভবন কিংবা নিজেদের গাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই গোলাগুলি ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল বাধ্যতামূলক ভোটার পরিচয়পত্রের দাবি জানানো—যা ছিল ভারতের নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, রাজ্য সরকারের নয়। এর ফলে এই মিছিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকের ধারণা ছিল, এটি কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়েরই একটি অংশ। যা আন্দোলন ১৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন প্রসঙ্গে জানা যায়, আন্দোলনকারীদের একাংশের মধ্যে একটি গোপন পরিকল্পনা ছিল, যেখানে বোরখা পরে মুসলিম মহিলার ছদ্মবেশে রেড রোডে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর গাড়ি আটকে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল। কংগ্রেস দল নিজে এই মিছিলকে পুরোপুরি সমর্থন করেনি বলেও জানা গিয়েছিল; এমনকি প্রবীণ নেতা গনি খান চৌধুরী পরদিন নয়াদিল্লির বঙ্গভবনে বসুর সঙ্গে দেখা করে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁকে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ২ অগস্ট, তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানিয়েছিলেন যে, সেদিন অনেক সশস্ত্র ও মদ্যপ অপরাধী সেখানে জড়ো হয়েছিল। এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস.বি. চবনও জ্যোতি বসুর সঙ্গে আলোচনার পর সিবিআই বা বিচার বিভাগীয় তদন্তের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করেননি।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। কমিশন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বিমান বসু-সহ বেশ কয়েকজন সাক্ষীকে তলব করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মৃত্যুর জন্য বামফ্রন্টের কোনও শীর্ষ নেতা বা পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়ী পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জমা দেওয়া কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, নিহত ১৩ জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছিল লিভার সিরোসিসের কারণে—সম্ভবত অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে—পুলিশের গুলিতে নয়।

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আরোহণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। সেই বিক্ষোভ এবং ১৩ জনের মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি বা সংহতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতি বছর ২১ জুলাই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গে ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। তবে নিহত ১৩ জনকে ‘শহিদ’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি বিতর্কিত; কারণ অভিযোগ রয়েছে যে, তাঁদের অনেকেই সশস্ত্র ছিলেন এবং পুলিশের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন।

সমালোচকদের মতে, সেদিনকার ঘটনাটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা ক্ষমতার লড়াইয়ের বিষয়ই বেশি ছিল। ১৯৯৩ সালের ‘রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান’ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব সুসংহত করার কাজে ব্যবহার করলেও, সেই বিক্ষোভের পেছনের উদ্দেশ্য এবং যে পরিস্থিতিতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, তা নিয়ে আজও নানা প্রশ্ন ওঠে। যে ব্যক্তি পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই মণীশ গুপ্ত, তিনি পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হন।

(তথ্য— উইকিপিডিয়া)

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle