সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) টাকেডা-র কিউডেঙ্গা (QDENGA) (TAK-003)-কে অনুমোদন দেওয়ার পর ডেঙ্গু প্রতিরোধের লড়াইয়ে ভারত একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, যা এটিকে দেশের প্রথম অনুমোদিত ডেঙ্গু ভ্যাকসিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অনুমোদনটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ভারত বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোর একটির তালিকায় রয়েছে, যেখানে নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, মশার আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গত দুই দশকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিউডেঙ্গা একটি লাইভ-অ্যাটেনিউটেড টেট্রাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন, অর্থাৎ এটি ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের (DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4) বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। পুরনো ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ডেংভ্যাক্সিয়ার মতো নয়, কিউডেঙ্গা নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না, যা বৃহৎ পরিসরের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা।
এই ভ্যাকসিনটি ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া এবং আর্জেন্টিনাসহ ৪০টিরও বেশি দেশে অনুমোদিত হয়েছে। ভারত এখন সেই তালিকায় যুক্ত হল এমন এক সময়ে, যখন ডেঙ্গু দেশের অন্যতম বড় মরসুমী জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
ভারতের প্রথম ডেঙ্গু ভ্যাকসিন সম্পর্কে আপনার যা যা জানা প্রয়োজন, তার সবকিছু এখানে রয়েছে—এটি কীভাবে কাজ করে, কারা এটি নিতে পারবেন, এটি কতটা কার্যকর, এর সম্ভাব্য মূল্য কত এবং কখন এটি সহজলভ্য হতে পারে।
কিউডেঙ্গা (QDENGA) কী?
কিউডেঙ্গা (QDENGA) (TAK-003) হল একটি জীবন্ত, দুর্বলীকৃত টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন, যা জাপানি অসুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা টাকেডা (Takeda) তৈরি করেছে।
এটি ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা উপসর্গযুক্ত ডেঙ্গু এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমায়, যার জন্য হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।
এই ভ্যাকসিনটি তিন মাসের ব্যবধানে দু’টি ডোজে দেওয়া হয়। এটি ত্বকের নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একটি বৃহত্তর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হিসেবে, যেসব দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে এর ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
ভারতের জন্য এই অনুমোদন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর মোট বোঝা বা প্রকোপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতে, এবং গত দুই দশকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১১ গুণেরও বেশি বেড়েছে। মরসুমী প্রাদুর্ভাব হাসপাতালগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে চলেছে, বিশেষ করে বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী মাসগুলোতে।
এখন পর্যন্ত, ভারত মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করত:
মশা নিয়ন্ত্রণ
মশার প্রজননস্থল নির্মূল করা
ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা
প্রাথমিক রোগ নির্ণয়
সহায়ক চিকিৎসা
এবার টিকার প্রাপ্যতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুক্ত হল
কারা এই টিকা নিতে পারবেন?
ভারতে অনুমোদিত সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপত্র সংক্রান্ত তথ্য টিকা চালুর সময় সিডিএসসিও (CDSCO) এবং তাকেদা (Takeda) বিস্তারিতভাবে জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে, কিউডেঙ্গা (QDENGA) বেশ কয়েকটি দেশে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুমোদিত হয়েছে এবং কোনও ব্যক্তির আগে ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছিল কি না, তা নির্বিশেষে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia)-র থেকে ভিন্ন, যা সেরোনেগেটিভ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে শুধুমাত্র পূর্বে ডেঙ্গু সংক্রমণের নথিভুক্ত প্রমাণ থাকা ব্যক্তিদের জন্য সুপারিশ করা হয়।
এই বৈশিষ্ট্যটি টিকা দেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা দূর করে ভারতে টিকাদান কর্মসূচিকে সহজ করে তুলতে পারে।
কিউডেঙ্গা (QDENGA) কতটা কার্যকর?
আটটি ডেঙ্গু-প্রবণ দেশ জুড়ে ২০,০০০-এরও বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ টাইডস (TIDES) ফেজ থ্রি ট্রায়ালের প্রমাণ আশাব্যঞ্জক দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল দেখিয়েছে।
সাড়ে ৪ বছর পর্যবেক্ষণের পর, এই টিকাটিকে সামনে আনা হয়েছে, যেখানে দেখা গিয়েছে—
ডেঙ্গু-জনিত হাসপাতালে ভর্তির বিরুদ্ধে ৮৪% সুরক্ষা
ভাইরোলজিক্যালি নিশ্চিত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে প্রায় ৬১% সুরক্ষা
পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং অনাক্রান্ত উভয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেই গুরুতর ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা, যদিও কার্যকারিতা ডেঙ্গু সেরোটাইপের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়েছে। এই ফলাফলগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ এবং একাধিক আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছে।
ভারতে কিউডেঙ্গার দাম কত হবে?
ভারতে এর আনুষ্ঠানিক মূল্য এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে, বেশ কিছু বিষয় এর ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে:
টাকিডা (Takeda) হায়দরাবাদ-ভিত্তিক বায়োলজিক্যাল ই (Biological E)-এর সঙ্গে ভারতে বার্ষিক ৫০ মিলিয়ন ডোজ পর্যন্ত উৎপাদনের জন্য একটি উৎপাদন অংশীদারিত্বে প্রবেশ করেছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে। স্থানীয় উৎপাদন সরবরাহ বাড়াতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
টিকাটি প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র বেসরকারি বাজারে চালু করা হবে, নাকি পরে সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তার উপরও মূল্য নির্ধারণ নির্ভর করবে।
বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, টিকা চালুর কাছাকাছি সময়ে মূল্য এবং বাণিজ্যিক প্রাপ্যতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সবার কি টিকার প্রয়োজন হবে?
এমনটা জরুরি নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুপারিশ করে যে, ডেঙ্গু টিকাদান একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে চালু করা উচিত, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
মশা নিয়ন্ত্রণ
জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা
প্রাথমিক রোগ নির্ণয়
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ
নজরদারি
টিকাদান মশার কামড় প্রতিরোধ বা মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়।
টিকা কি ডেঙ্গু নির্মূল করতে পারে?
না। এমনকি অত্যন্ত কার্যকর টিকাও ডেঙ্গু সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে পারে না, কারণ:
একই সঙ্গে চারটি ভিন্ন ভাইরাস সেরোটাইপ সক্রিয় থাকে।
মশার সংখ্যা ক্রমাগত সংক্রমণ ছড়াতে থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে মশার আবাসস্থল প্রসারিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, টিকাদান বিদ্যমান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিপূরক হওয়া উচিত, প্রতিস্থাপন নয়।
ভারতের জন্য এর তাৎপর্য কী?
এই অনুমোদন ভারতের ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে মরসুমী প্রাদুর্ভাবের সময় ‘কিউডেঙ্গা’ (QDENGA) গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তির হার এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ‘বায়োলজিক্যাল ই’ (Biological E)-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব ভারতকে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু টিকা সরবরাহের একটি প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছে।
একই সঙ্গে, গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমাতে ধারাবাহিক নজরদারি, বাহক বা ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
‘কিউডেঙ্গা’-র অনুমোদন ডেঙ্গু মোকাবিলায় ভারতের প্রচেষ্টায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি; এটি এমন একটি রোগের বিরুদ্ধে দেশের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত টিকা যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষকে আক্রান্ত করে। যদিও এর মূল্য নির্ধারণ, প্রয়োগ প্রক্রিয়া এবং সরকারি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, তবুও সংক্রমণের পূর্ব-পরীক্ষা ছাড়াই ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা প্রদানের সক্ষমতা এটিকে ভারতের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কৌশলে একটি অত্যন্ত মূল্যবান সংযোজন করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও, বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে টিকাদান কার্যক্রম মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি চলতে হবে—এগুলোর বিকল্প হিসেবে নয়।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
