ভাবুন তো, আপনার একটানা এক বছর ধরে তীব্র মাথাব্যথা হচ্ছে, অথচ আপনি এর জন্য কোনও ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন না। সাধারণ মাথাব্যথা ভেবে ইগনোর করছেন। ‘আমাহা’ নামের একটি স্টার্টআপ তাদের একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে, যা দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা (Mental Health) পাওয়ার এক অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অবস্থাটা ঠিক এমনই। আমাহার ‘মেন্টাল হেলথ রিপোর্ট ২০২৬’-এর উত্তরদাতাদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৩%) পেশাদারী সেবা নেওয়ার আগে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন। প্রতিবেদনটিতে আরও দেখা গিয়েছে যে, ৯৪.৯% মানুষ একই সঙ্গে দুই বা ততোধিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন, যা সহায়তা পাওয়ার আগে মানুষের সম্মুখীন হওয়া জটিল প্রতিবন্ধকতাগুলোকে তুলে ধরে।
‘দ্য আমাহা মেন্টাল হেলথ রিপোর্ট ২০২৬: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য জার্নি টু কেয়ার ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি ১৩,৮২৫ জন মানুষের মতামতের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যারা অক্টোবর ২০২৫ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আমাহার সেবা শুরু করার আগে মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছিলেন। এতে আনুষ্ঠানিক সেবায় প্রবেশের আগের সময়কালটি খতিয়ে দেখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তারা প্রথমে কার কাছে যান, কীভাবে মানসিক কষ্টের মোকাবিলা করেন এবং পেশাদারী সহায়তা চাওয়ার আগে কতদিন অপেক্ষা করেন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বিলম্বের তালিকাই দীর্ঘ। মাত্র ১১.৩% উত্তরদাতা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনুভব করার এক মাসের মধ্যে পেশাদার সেবা গ্রহণ করেছেন। সহায়তা চাওয়ার আগে, অনেকেই অনানুষ্ঠানিক বা স্ব-নির্দেশিত পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন।
এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরছে যে, পেশাদার সেবা গ্রহণ করার আগে বা পুনরায় সেবা নেওয়ার আগে মানুষ তাদের সমস্যাগুলো সামাল দেওয়ার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে।
সমস্যা মোকাবিলার কৌশল হিসেবে সবার উপরে রয়েছে অ্যালকোহল। সামগ্রিকভাবে, ১৫.৪% উত্তরদাতা পেশাদার সহায়তা নেওয়ার আগে অ্যালকোহল বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ১৮ থেকে ৫৪ বছর বয়সী প্রতিটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই মহিলাদের তুলনায় এই ধরনের পথে হাঁটার সম্ভাবনা বেশি, এবং বয়স্কদের মধ্যে এই পার্থক্য আরও বাড়তে পারে।
চিকিৎসা নেওয়ার আগে ৮২.৭% উত্তরদাতা মূল বিষয়টিকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে, যেমন—অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অতিরিক্ত ঘুম এবং অতিরিক্ত কাজ করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ৪৩.১% উত্তরদাতা ব্যায়াম বা ডায়েরি লেখার মতো সঠিক পথও গ্রহন করার কথা জানিয়েছেন।
উত্তরদাতারা একাধিক পথ বেছে নিতে পারতেন, তাই এই পরিসংখ্যানগুলো পরস্পর স্বতন্ত্র নয়। এর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল কতজন নিজের ক্ষতি করার কথা ভেবেছেন? একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল যে, পেশাদার যত্ন নেওয়ার আগে ৫৬.২% উত্তরদাতা নিজের ক্ষতির করা মানসিকতার কথা জানিয়েছেন। কর্মজীবী বা পেশাজীবীদের (৫৩.২%) তুলনায় শিক্ষার্থী (৭১.৭%) এবং বেকার উত্তরদাতাদের (৬৪.৭%) মধ্যে এই অনুপাত বেশি ছিল।
যখন প্রাথমিক উদ্বেগ ক্লিনিকাল মূল্যায়নের থেকে ভিন্ন হয় তখন মানুষ প্রাথমিকভাবে যে উদ্বেগগুলো চিহ্নিত করে এবং ক্লিনিকাল মূল্যায়নের পরে তারা যে রোগ নির্ণয় পায়, তার মধ্যের পার্থক্যও পরীক্ষা করা হয়েছে। যারা নিজেদেরকে মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে ৩৩% পরবর্তীতে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত বলে চিহ্নিত হয়েছেন।
যারা উদ্বেগকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তাদের মধ্যে ১০% এডিএইচডি-তে আক্রান্ত বলে নির্ণীত হন। যারা পুনরাবৃত্তিমূলক চিন্তা ও আচরণের কথা বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে ৩২% আক্রান্ত বলে নির্ণীত হন। বিষণ্নতায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন এবং ১১% ব্যক্তি অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডারে (OCD) আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায়শই একাধিক সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেয়। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা গড়ে পাঁচটি করে সমস্যার কথা জানিয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় যে চিকিৎসা নেওয়ার আগে তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেকগুলো বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলোর কথা জানানো গিয়েছে, সেগুলো হল:
উদ্বেগ (Anxiety): ৭২.১%
মানসিক চাপ (Stress): ৬৭.৫%
মন খারাপ বা বিষণ্ন ভাব (Low mood): ৫৮.৩%
সম্পর্ক বা পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা: ৫৫.৬%
ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন (Mood swings): ৫৪.১%
প্রতিবেদনে আরও দেখা গিয়েছে, যারা ঘুমের সমস্যার কথা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮৩% ব্যক্তি উদ্বেগের (anxiety) সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন।
চিকিৎসা নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই, অনেক অংশগ্রহণকারীর দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলাতে হিমশিম খাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। মাত্র ১২.৩% জানিয়েছেন যে তারা তাদের দৈনন্দিন সব কাজ ঠিকমতো সামলাতে পারেন; অন্যদিকে, ২৭.৩% জানিয়েছেন যে তারা অধিকাংশ কাজ অথবা কোনও কাজই ঠিকমতো সামলাতে পারছেন না।
এই সব ক্ষেত্রে থেরাপি এবং সাইকিয়াট্রি (মানসিক রোগের চিকিৎসা) একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। দেখা গিয়েছে মানুষ কীভাবে থেরাপি এবং সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। যারা প্রথমে থেরাপি নেওয়া শুরু করেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৭% পরবর্তীতে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের (মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ) পরামর্শ নিয়েছেন। আবার যারা প্রথমে সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসা শুরু করেছিলেন, তাদের মধ্যে ২০% পরবর্তীতে থেরাপি নেওয়া শুরু করেছেন। যারা সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসা শুরুর পর থেরাপি নেওয়া শুরু করেছেন, তাদের মধ্যে ৯৩% ব্যক্তিই সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসার প্রথম তিনটি সেশনের মধ্যেই থেরাপি নেওয়া শুরু করেছিলেন।
যারা সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৫৬.৯% ব্যক্তির অবস্থার উন্নতি হয়েছে চতুর্থ সেশনের মধ্যেই। চিকিৎসকরা ‘ক্লিনিক্যাল গ্লোবাল ইম্প্রেশন’ (CGI) স্কেল ব্যবহার করে এই উন্নতির মূল্যায়ন করেছেন।
দ্রষ্টব্য: এই ফলাফলগুলো এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, যারা পরবর্তীতে ‘আমাহা’ (Amaha)-এর মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়েছেন। এগুলোকে বৃহত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মঘাতী চিন্তা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
