বৃষ্টির মধ্যে ভিড়, হুড়োহুড়ি, তারপর এক ভয়াবহ রাত (Evening At Chorbagan)—উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে প্রাণ গেল অন্তত ১৮ জনের। না এখনই নিশ্চিত করে সংখ্যাটা বলা যাচ্ছে না।
দুর্গাপুজো মানেই আলো, আনন্দ, মানুষের ঢল। কিন্তু মহাসপ্তমীর রাতে উত্তর কলকাতার চোরবাগানে সেই উৎসবই পরিণত হল ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলে। শনিবার, ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় সারদা পার্কের চোরবাগান (Evening At Chorbagan) সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
মাত্র কয়েক মিনিটেই বদলে গেল পরিস্থিতি
কলকাতা পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ মণ্ডপের বেরোনোর গেটের কাছে বিপুল ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্টের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে এবং মণ্ডপের দিকে এগোতে দর্শনার্থীদের মধ্যে আচমকা চাপ তৈরি হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের চাপ ভয়াবহ আকার নেয়।
প্রাথমিক তদন্তে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। ঘটনাস্থলে থাকা এক পুলিশ আধিকারিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার ঘোষণা এবং কয়েকবার বাঁশি বাজানোর পর পরিস্থিতির অবনতি হয়। তবে এটিই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ কি না, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জুতো, আতঙ্কে স্বজনেরা
দুর্ঘটনার পর মণ্ডপ চত্বরে তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের মধ্যে অনেকে মাটিতে পড়ে যান। বহু মানুষ আহত হন। মণ্ডপের বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জুতো-স্যান্ডেল যেন কয়েক মিনিট আগের ভয়াবহতার নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছনোর পর শুরু হয় জরুরি চিকিৎসা। স্বজনেরা ছুটে আসেন হাসপাতাল চত্বরে। কারও চোখে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, কারও মুখে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যের খোঁজ।
প্রশাসনের তৎপরতা, শুরু তদন্ত
ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ দল। দর্শনার্থীদের মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। উদ্ধারকাজে নামে পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন এবং চিকিৎসার খোঁজ নেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত হবে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পুজো কমিটির সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী এবং দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে যাঁদের গাফিলতি পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে
দুর্গাপুজোর সময় কলকাতার বড় পুজোমণ্ডপগুলিতে বিপুল ভিড় নতুন ঘটনা নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—চোরবাগানে এত মানুষের ভিড় সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি?
প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কতটা প্রশস্ত ছিল? বৃষ্টির পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা কী ছিল? নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল কি না? কোনও ঘোষণা বা সতর্কবার্তা কীভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের অংশ।
তদন্তকারীরা মণ্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রবেশ-প্রস্থান পথ, দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা এবং ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখছেন।
রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু
ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের আগে কোনও পক্ষকেই দায়ী না করে প্রকৃত কারণ সামনে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দুর্ঘটনার পিছনে শুধু ভিড় নয়, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি—সবকিছুরই ভূমিকা থাকতে পারে।
শোকস্তব্ধ বাংলা
চোরবাগানের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। প্রধানমন্ত্রী মৃতদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।
অমিত শাহ তাঁর পশ্চিমবঙ্গ সফরের রবিবারের কর্মসূচি বাতিল করে আহতদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
উৎসবের শহরে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন
চোরবাগানের রাত শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি প্রশ্ন তুলেছে—বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবে যখন শহরের রাস্তায় লাখো মানুষের ভিড় নামে, তখন সেই ভিড়ের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
একটি ঘোষণা, কয়েকটি বাঁশির শব্দ, বৃষ্টি এবং কয়েক মুহূর্তের হুড়োহুড়ি কীভাবে এতগুলো পরিবারকে শোকে ডুবিয়ে দিতে পারে, তার উত্তর খুঁজতেই হবে।
কারণ পুজোর আনন্দ যেন আর কখনও কারও কাছে প্রিয়জন হারানোর স্মৃতি হয়ে না থাকে।
চোরবাগানের মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার প্রার্থনা।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
