কখনও আনন্দ, কখনও চোখের জল—দশমী মানেই মাকে বিদায় জানানোর দিন। চার দিনের উৎসব, নতুন জামা, ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোর ঝলকানি আর প্যান্ডেল-পরিক্রমার পর অবশেষে আসে সেই দিন—বিজয়া দশমী (Bijoya Dashami)। বাঙালির কাছে এই দিন শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং আবেগ, ভালোবাসা এবং অপেক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধন। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজয়া দশমী পালিত হচ্ছে ২১ অক্টোবর।
দশমীর সকাল থেকেই পুজোমণ্ডপের পরিবেশ বদলে যায়। কয়েকদিনের উৎসবের উচ্ছ্বাসের মাঝেও কোথাও যেন বিষাদের সুর। কারণ আজই যে উমাকে বিদায় দিতে হবে। বাঙালির বিশ্বাসে, মেয়ে উমা বছরে একবার সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন। কয়েকদিনের আনন্দের পর দশমীতে আবার তাঁকে ফিরে যেতে হয় কৈলাসে, স্বামী মহাদেবের কাছে।
দশমীর অন্যতম পরিচিত রীতি সিঁদুর খেলা। দেবীকে সিঁদুর পরানোর পর বিবাহিত মহিলারা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। লাল-সাদা শাড়িতে সেজে, ঢাকের তালে, হাসি-আনন্দে মেতে ওঠেন তাঁরা।
এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের মঙ্গল, সুখ ও সমৃদ্ধির কামনা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিঁদুর খেলা শুধুমাত্র একটি আচার না থেকে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত ছবি হয়ে উঠেছে।
বিসর্জনের আগে হয় দেবীবরণ। দেবীর সামনে মিষ্টি, পান, সিঁদুর-সহ বিভিন্ন সামগ্রী নিবেদন করে তাঁকে বিদায় জানানো হয়। ভক্তদের একটাই প্রার্থনা—মা যেন পরিবারের সকলকে ভালো রাখেন, আগামী বছর আবার যেন ফিরে আসেন। এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
বিকেল গড়াতেই শুরু হয় বিসর্জনের প্রস্তুতি। ঢাকের তালে, নাচে-গানে, ‘বলো দুর্গা মাই কি জয়’ ধ্বনিতে প্রতিমা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভক্তরা।
গঙ্গার ঘাটে পৌঁছনোর পর আসে সেই আবেগঘন মুহূর্ত। ধীরে ধীরে জলে মিশে যায় মায়ের প্রতিমা। ভক্তদের কণ্ঠে তখন একটাই ডাক—
“আসছে বছর আবার হবে।”
এই বিসর্জন শুধুমাত্র প্রতিমা জলে মিশিয়ে দেওয়ার রীতি নয়। এর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের চিরন্তন দর্শন। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিসর্জনকে দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
দশমীর পর শুরু হয় বিজয়া। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে, বড়রা আশীর্বাদ করেন। আত্মীয়-বন্ধুদের বাড়িতে শুরু হয় যাতায়াত। মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় নতুন সম্পর্কের উষ্ণতা।
বিজয়ার প্রণাম যেন মনে করিয়ে দেয়—উৎসব শেষ হলেও সম্পর্কের উৎসব যেন শেষ না হয়।
বাঙালির দশমীর সঙ্গে আরও একটি প্রাচীন রীতি জড়িয়ে রয়েছে—অপরাজিতা পূজা। বিজয়া দশমীর দিন দেবী অপরাজিতার আরাধনা করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, অপরাজিতা হলেন দেবীর এমন এক রূপ যাঁকে পরাজিত করা যায় না। এই পূজার সঙ্গে জীবনের বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আশার সম্পর্ক রয়েছে।
দশমীর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ডেলগুলির আলো নিভতে শুরু করে। ঢাকের আওয়াজ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়। রাস্তার ভিড় কমে আসে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে শহর উৎসবের রঙে রঙিন ছিল, সেখানে নেমে আসে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
তবু এই শূন্যতার মধ্যেই বাঙালি খুঁজে নেয় আগামী বছরের স্বপ্ন। কারণ বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো কখনও সত্যিই শেষ হয় না। মা চলে যান, কিন্তু রেখে যান আশীর্বাদ, স্মৃতি আর ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
তাই দশমীর শেষ ডাক আসলে বিদায়ের নয়—আবার দেখা হওয়ার ডাক।
“শুভ বিজয়া। আসছে বছর আবার হবে।”
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
