কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ের খবরটি জুডোকা অস্মিতা দে (Asmita Dey) সবার আগে যাকে জানাতে চেয়েছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত তাকে আর তা জানানোর উপায় ছিল না। ত্রিপুরার এক ছোট গ্রামে মাটির বাড়িতে বেড়ে ওঠা অস্মিতার বাবা—যিনি সাইকেল সারাইয়ের কাজ করে মাসে মাত্র ৩০০ টাকা আয় করতেন—সাত মাস আগে ব্রেন স্ট্রোকে মারা যান। শুক্রবার, ২৩ বছর বয়সী অস্মিতা যখন মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কমনওয়েলথ গেমসে সোনাজয়ী প্রথম ভারতীয় জুডোকা হলেন, তখন মনে হল এই পদক যতটা তাঁর নিজের, ঠিক ততটাই তাঁর বাবার। ঐতিহাসিক জয়ের পর চোখের জল সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টায় অস্মিতা বললেন, ‘‘বাবা যখন মারা গেলেন, তখন মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গিয়েছে; কারণ তিনিই তো আমাকে সবরকম সহায়তা করতেন।’’
কিছুক্ষণের জন্য উদযাপনের আমেজ ছাপিয়ে ভেসে এল সেই মানুষটির স্মৃতি, যিনি অস্মিতার স্বপ্নকে লালন করেছিলেন—এমনকি সেই স্বপ্ন যখন ভারতের স্বপ্নে পরিণত হওয়ার অনেক আগে থেকেই। তিনি বললেন, ‘‘আমি ত্রিপুরার খুব ছোট একটা গ্রাম থেকে এসেছি। সেখানকার মানুষ সাধারণত এত বড় স্বপ্ন দেখে না। কিন্তু বাবা সবসময় আমাকে সমর্থন জুগিয়েছেন।’’
আর্থিক অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁর বাবা সাইকেল সারাইয়ের কাজ করতেন; দিনে প্রায় ৩০০ টাকা আয় হতো, যা দিয়ে কোনওমতে সংসার চলত। পুরো পরিবার একটি সাধারণ মাটির বাড়িতে থাকত, কিন্তু মেয়ের প্রিয় খেলা চালিয়ে যাওয়ার পথে আর্থিক অভাবকে তিনি কখনওই বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেননি।
হাঁটুর চোট যখন তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তখন বাবা তাঁকে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিলেন, অসুধ কিনে দিয়েছিলেন এবং তিনি যাতে আবার খেলার ময়দানে ফিরতে পারেন, তার জন্য সাধ্যমতো সব কিছুই করেছিলেন। অস্মিতা স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘‘তিনিই আমাকে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং অসুধ কিনে দিয়েছিলেন।’’
গত ডিসেম্বরে বাবার আকস্মিক মৃত্যু অস্মিতাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। যিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক ও ভরসার জায়গা, তিনি চলে গেলেন; আর তাঁর সঙ্গেই যেন হারিয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার স্বপ্নও। কিন্তু অস্মিতা যখন এই শোক সামলে ওঠার লড়াই করছিলেন, তখন তাঁর মা নীরবে স্বামীর রেখে যাওয়া সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। শেষকৃত্যের মাত্র ১০ দিন পরেই তিনি মেয়েকে অনুশীলনে ফিরে যাওয়ার কথা বললেন। তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, ‘‘আজ যদি আমি তোমাকে আটকে দিই, তবে তোমার বাবা ভাববেন যে আমিই তোমার স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছি।’’
এরপর অস্মিতা ব্যাগ গুছিয়ে ভোপালের ‘স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’য় ফিরে গিয়েছিলেন। কমনওয়েলথ গেমসের আগে তিনি তীব্র উদ্বেগের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এবং বহু নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। ‘‘এর জন্য আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। এই পদক জয়ের আগে ভারতে থাকাকালীন আমি ঠিকমতো ঘুমাতেই পারতাম না। ম্যাচের কথা ভেবেই জেগে থাকতাম। শরীর ক্লান্ত থাকলেও ঘুম আসত না। অস্থির লাগত, অথচ পরদিন ভোর সাড়ে ৫টায় আবার অনুশীলনের জন্য উঠতে হতো।’’ গ্লাসগোয় পৌঁছানোর পরেও সেই মানসিক চাপ বা উদ্বেগ তাঁর পিছু ছাড়েনি।
‘‘এখানে পৌঁছানোর পর কী হবে—তা ভেবে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। শুধু একটাই ভাবনা মাথায় ঘুরত যে, আমাকে সবাইকে হারিয়ে জিততেই হবে।’’ জয়ের সেই দৃঢ় সংকল্প কেবল অনুশীলনের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এমনকি জীবনের ছোটখাটো আনন্দের বিষয়গুলোও তাঁকে তাঁর লক্ষ্যের কথা মনে করিয়ে দিত।
তাঁর ভাইয়ের কিনে দেওয়া প্রিয় মিষ্টি ‘লং লতা’ বাড়িতে ফ্রিজের ভেতর অবিকৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। হাসিমুখে তিনি বললেন, ‘‘ফ্রিজে ওটা দেখতাম আর অনেকবারই প্রায় খেয়ে ফেলার উপক্রম করতাম, কিন্তু শেষমেশ নিজেকে থামিয়ে নিতাম।’’
শুক্রবার, তাঁর সেই সব ত্যাগের সার্থক পরিণতি ঘটল। এই স্বর্ণপদক ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ল। সঙ্গে দেশের মুকুটে নতুন নাম যুক্ত হল।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
