ফিফা বিশ্বকাপের দ্রুততম গোলের মালিক Hakan Sukur আজও ফিরতে পারেননি দেশে

Hakan Sukur

ভারতীয় সময় অনুযায়ী শনিবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর দ্রুততম গোলের রেকর্ডটি দু’বার তৈরি হয়। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি মাত্র ৭০ সেকেন্ডে গোল করেন, কিন্তু তুরস্কের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের মাতিয়াস গালারজা মাত্র ৬৫ সেকেন্ডে গোল করে সেই রেকর্ডটি নিজের দখলে নেন। তবে তাদের দু’জনের কেউই ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম গোলের রেকর্ডটি ভাঙতে পারেননি; ২০০২ সালের বিশ্বকাপে তুরস্কের কিংবদন্তি হাকান সুকুর (Hakan Sukur) সেই রেকর্ডটি গড়েছিলেন। ২০০২ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলা শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে তিনি দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তুরস্ককে ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক জেতানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া সত্ত্বেও, হাকান সুকুর এখন নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন; তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং দেশে ফিরতে পারছেন না। কিন্তু কেন নির্বাসিত হাকান সুকুর?


২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে অপমান করার অভিযোগে হাকান সুকুরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ‘গুলেন মুভমেন্ট’-এর সঙ্গে কথিত সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়; এরদোয়ান-নেতৃত্বাধীন সরকার এই ধর্মীয় সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।

তবে ততদিনে সুকুর দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে সুকুর জানান যে, তিনি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্ক ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোর ‘বে এরিয়া’ (Bay Area)-তে চলে গিয়েছিলেন। মূলত ব্যবসার সুযোগের সন্ধানেই সুকুর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যেতে বাধ্য করে, যার ফলে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি।

এটি ছিল ভাগ্যের এক নাটকীয় পরিবর্তন; কারণ মাত্র কয়েক বছর আগেই, ২০১১ সালে তিনি তুরস্কের পার্লামেন্ট বা ‘গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’-র সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু গুলেন মুভমেন্টের সঙ্গে কথিত সম্পৃক্ততার জেরে ২০১৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকার জন্য সুকুরকে পার্টনারশিপে ক্যাফে-মালিক হিসেবে কাজ করা, উবর চালক হিসেবে গাড়ি চালানো এবং বই বিক্রির মতো কাজ করতে হয়েছে। ২০১৯ সালে নিজের ইউটিউব চ্যানেলের একটি ভিডিওতে সুকুর জানান যে, তুরস্ক সরকার তাঁর দেশের সমস্ত সম্পত্তি, ব্যবসা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করেছে। একজন তুর্কি ফুটবল কিংবদন্তিকে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

সুকুর তুরস্কের জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ১২০টি ম্যাচে ৫১টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর সেই অর্জনের স্মৃতি বা উত্তরাধিকারকে মুছে ফেলার সক্রিয় প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময়, তুরস্কের একটি সম্প্রচার অনুষ্ঠানে ধারাভাষ্যকার প্রসঙ্গক্রমে সুকুরের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এর ফল কী হয়েছিল? বিরতির সময় ওই ধারাভাষ্যকারকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দিন শেষে তাঁকে ছেটে ফেলা হয়।

সুকুর আজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন যেখান থেকে নিজের জন্মভূমিতে ফেরার আর কোনও পথ খোলা নেই।

প্রসঙ্গত, তুরস্ক ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে, যার একটা বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র আয়োজন করছে। ২০০২ সালে সুকুরের নেতৃত্বে দলটি তৃতীয় স্থান অর্জন করার পর এই প্রথম তারা কোনও বড় টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা পেল। সুকুর যেখানে বসবাস করেন সেই সান ফ্রান্সিসকোতেই একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে; কিন্তু তিনি সেই ম্যাচটি দেখতে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। কারণ, স্টেডিয়ামে তুরস্ক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।

‘দ্য সান ফ্রান্সিসকো স্ট্যান্ডার্ড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকোতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তুরস্কের ম্যাচের আগে সুকুর বলেন, ‘‘আমি দেশে ফিরতে পারি না, তাই ঈশ্বরই যেন (দলটিকে) এখানে সান ফ্রান্সিসকোতে নিয়ে এসেছেন।’’

২০০২ সালের ২৯ জুন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলা শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় সুকুর তুরস্কের হয়ে প্রথম গোলটি করেছিলেন। এটি ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম গোল হিসেবে আজও অটুট রয়েছে এবং সেই রাতটি তুর্কি ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নামকে কিংবদন্তির মর্যাদায় আসীন করেছিল। অথচ, ২৪ বছর পর তুরস্কের সর্বকালের সেরা এই ফুটবলারের সেই অর্জন ও পরিচিতি আজ তাঁর নিজের দেশের মানুষের কাছে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle