সুচরিতা সেন চৌধুরী: ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই উচ্ছ্বাসের বাধ ভাঙল কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে। আট হাজারের গ্যালারি ফেন্সিং টপকে ঢুকে পড়ল মাঠের মধ্যে। সমর্থকদের আবেগে ভেসে গেলেন ইস্টবেঙ্গলের কোচ, ফুটবলাররা। একটা সময়ের পর প্লেয়ারদের আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কখনও ভিরের মধ্যে দিয়ে সমর্থকদের কাঁধে দেখা গেল গিল, এজেজ্জারিদের। ততক্ষণে লাল-হলুদ আবীরে মাখামাখি তাঁদের মুখ। চ্যাম্পিয়ন দল। অনেক স্বপ্ন ভঙ্গ, অনেক হতাশা, অনেক কটূ কথার যন্ত্রণা সহ্য করে এই দিন এল ইস্টবেঙ্গলের ঘরে। সমর্থকদের সরাতে র্যাফ নামল ঠিকই কিন্তু ব্যর্থ তারা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমর্থকরা থেকে গেল মাঠে। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হল, রাত পেরিয়ে মধ্য রাত, ভোরও হল লাল-হলুদ রঙেই। ভারতীয় ফুটবলে আবার নিজেদের পুরনো গৌরব ফিরে পেল ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)।
ভারতীয় ফুটবলে এমন দিন অতীতে এসেছে কিনা জানা নেই। তবে না হতে হতে হওয়া মাত্র ১৩ ম্যাচের আইএসএল-এর শেষ ম্যাচে যখন চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে নামে পাঁচ দল তখন তা ঘিরে উত্তেজনার পারদ যে তুঙ্গে থাকবে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। হলও তাই। যে ইস্টবেঙ্গলকে প্রায় চ্যাম্পিয়ন ধরেই নেওয়া হয়েছিল তারাই প্রথমার্ধ শেষ করল ০-১ গোলে পিছিয়ে থেকে। কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে ইন্টারকাশীর বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে রীতিমতো চাপে থাকল ইস্টবেঙ্গল। আর সেই সুযোগ নিয়েই এগিয়ে গেল ইন্টারকাশী। অন্যদিকে বাকি তিন ম্যাচে চ্যাম্পিয়নশিপের লক্ষ্যে মুখোমুখি হয়েছিল পঞ্জাব-মুম্বই, মোহনবাগান-দিল্লি ও জামশেদপুর-ওড়িশা। এই তিন ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল গোলশূন্য ভাবেই। চেনা গোল মিসের বহরও দেখা গেল মোহনবাগানের জেসন কামিন্সের পা থেকে। অন্যদিকে তখনও ইকুয়েশন, যে কেউ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু দিন শেষে ভারতীয় ফুটবলের রঙ লাল-হলুদ।
যখন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দিল্লির বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিল মোহনবাগান, তখন কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে ২২ বছরের অধরা স্বপ্নকে ছোঁয়ার লক্ষ্যে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল। আইএসএল-এ এক সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান চ্যাম্পিয়নশিপের দৌঁড়ে রয়েছে, এমন ঘটনা অতীতে ঘটেনি। এই প্রথম সেই মুহূর্ত তৈরি হল ভারতীয় ফুটবলে যখন দুটো ভিন্ন ম্যাচে দুই প্রধানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই চলল এক সঙ্গে। মোহনবাগান দ্বিতীয়ার্ধে গোল হজম করে যখন পিছিয়ে পড়ল ততক্ষণে সমতায় ফিরেছে ইস্টবেঙ্গল। ১৪ মিনিটে অ্যালফ্রেডের গোলে ইস্টবেঙ্গলকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল ইন্টারকাশী। ৫০ মিনিটে সমতায় ফেরে অস্কারের দল। আর প্রথমার্ধ গোলশূন্য রাখার পর ৬৩ মিনিটে গোল হজম করে মোহনবাগান।
ইস্টবেঙ্গল বনাম ইন্টারকাশী ম্যাচের বয়স তখন সবে ১৫ মিনিটই হয়েছিল। তার আগে পর পর আক্রমণে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। আর তার মধেই ডেভিডের লম্বা সেন্টার থেকে অ্যালফ্রেড যেভাবে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণকে ফাঁকি দিয়ে জালে বল জরালেন তাতে অনেক টাকার টিকিট কেটে কিশোরভারতীর গ্যালারি ভরানো সমর্থকদের হতাশায় ডুবে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ডার্বির পর গোল মিসের বহর এখানেও বজায় থাকল ইস্টবেঙ্গলের। ২৩ মিনিটে বিপিনের সেন্টার থেকে এজেজ্জারির নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট থেকে অ্যালফ্রেডের দ্বিতীয় গোলের প্রচেষ্টা মাথার উপর দিয়ে গিলের দুরন্ত সেভ, সবই ছিল এদিনের ম্যাচে। ঝামেলায়ও জরাল দুই দলের ফুটবলাররা, যদিও তা বেশিদূর গড়ায়নি। ৪১ মিনিটে রাকিপ চোট পেয়ে বেরিয়ে গেলে ডেভিডকে নামিয়ে আক্রমণে ঝাঁঝ বাড়ালেন অস্কার। নেমেই গোলের সুযোগও তৈরি করলেন ভারতীয় এই স্ট্রাইকার। যদিও ইস্টবেঙ্গলকে সমতায় ফেরালেন সেই এজেজ্জারি। যিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে শীর্ষে থেকেই শেষ করলেন।
আনোয়ারের পাস থেকে বক্সের মধ্যে বল পেয়ে গিয়েছিলেন ইউসুফ এজেজ্জারি। গোল মুখ ছোট করতে নিজের জায়গা ছেড়ে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছিলেন ইন্টার গোলকিপার শুভম ধাস। কিন্তু সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে তাঁর পায়ের ফাঁক দিয়েই বল নিয়ে গোলে পাঠালেন আইএসএল ২০২৫-২৬-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা। যদিও ৭২ মিনিটে তাঁকে তুলে অ্যান্টন সোজবার্গকে নামিয়ে দিলেন ইস্টবেঙ্গল কোচ। অন্যদিকে আনোয়ারকে তুলে নামালেন সৌভিক চক্রবর্তীকে। এক মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান বাড়ালেন রশিদ। যখন বিপিনের পাস থেকে দুরন্ত শটে বল জালে জরালেন তিনি। ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে যাওয়ায় উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ ঘটল কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে।
অন্যদিকে পঞ্জাব বনাম মুম্বই ম্যাচের ৮০ মিনিটে আকাশ মিশ্রার পাস থেকে ভালপুইয়ার গোলে এগিয়ে যায় মুম্বই। তার আগেই অবশ্য লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন পঞ্জাবের লিও অগাস্টিন। শেষ বেলায় পঞ্জাবের দ্বিতীয় লালকার্ড দেখলেন প্রমভীর। বার বার ঝামেলায় জরাল দুই দলের ফুটবলাররা। যার ফল ১১ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে বিক্রম প্রতাপ সিংয়ের গোলে ২-০ গোলে পঞ্জাবকে হারিয়ে লিগ শেষ করল মুম্বই। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া মোহনবাগানকে ৯০ মিনিটে সমতায় ফেরালেন মনবীর সিং। এখানেই শেষ নয়, জিতেই মাঠ ছাড়ল মোহনবাগান ম্যাকলারেনের শেষ মুহূর্তের গোলে কিন্তু ততক্ষণে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়েছে ইস্টবেঙ্গল। যদিও পয়েন্টের নিরিখে সমানে সমানেই থেকে গেল কলকাতার দুই প্রধান, তবে গোল পার্থক্যে চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল। ২২ বছর পর জাতীয় স্তরের কোনও ট্রফি জয়ের স্বাদ পেল ইস্টবেঙ্গল।
দলকে ২২ বছর পর লিগ চ্যাম্পিয়ন করে কি আরও একটা মরসুম থেকে যাবেন অস্কার ব্রুজোঁ?
ইস্টবেঙ্গল: প্রভসুখন সিংহ গিল, মহম্মদ রকিপ (ডেভিড), আনোয়ার আলি (সৌভিক চক্রবর্তী), কেভিন সিবিল্লে, জয় গুপ্ত (লালচুংনুঙ্গা), বিপিন সিংহ, জিকসন সিংহ, মহম্মদ রশিদ, মিগুয়েল ফিগুয়েরা, পি ভি বিষ্ণু (নন্ধা কুমার) ও ইউসেফ এজ়েজ্জারি (অ্যান্টন সোজবার্গ)।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
