Pakim-এর পাখির বাসায় ১০ মাস আর এক ঝুড়ি সারাজীবনের স্মৃতি

Pakim

শুচিস্মিতা সেন চৌধুরী: ২০ বছর আগের কথা, সদ্য বাবাকে হারিয়ে মনে হয়েছিল একটা চাকরির খুব দরকার। আর ঠিক সে সময় খবর পেলাম সিকিমের একটা কলেজে শিক্ষক নেওয়া হবে সমাজতত্ত্বের। নৃতত্ব পড়ার সুবাদে আবেদন করে দিলাম। এবার যেতে হবে ইন্টারভিউ দিতে। জানতাম চাকরিটা হবে। কারণ সিকিমের এক ছোট শহর পাকিমে (Pakim) তখন যেতে চাইছেন না কেউ। বেশিরভাগ বাঙালির পাহাড়ে যাওয়ার কথা শুনলেই মনটা ভালো হয়ে যায়, আমারও হলো। কিন্তু একদম অচেনা অজানা জায়গায় একা যাওয়ার কথা শুনে মা ভয় পেলেন, হয়তো আমিও। সঙ্গি পেলাম না তেমন কাউকে। সময়টা জুলাই মাসের শেষের দিকে, শিলিগুড়ি থেকে গাড়িতে পৌঁছলাম রানিপুল। এখান থেকে দুটো রাস্তা; একটা চলে গিয়েছে গ্যাংটকের দিকে আর একটা পাকিয়াং বা পাকিমের দিকে। রানিপুলে যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। পাহাড়ে রাত তাড়াতাড়ি নামে। মেঘলা পাহাড়, বৃষ্টিও পড়ছে, তার মধ্যেই একটা মারুতি ভ্যান রিসার্ভ করতে হলো পাকিম যাওয়ার জন্য। পথের দুধারে বড়  বড়  গাছ। খুব একটা গাড়ির চলাচল  নেই। ইতি উতি ঝরনার দেখা যাচ্ছে।  পেরোলাম গা ছমছম করা সেতু আন্ধেরি খোলা, পরে শুনেছি জায়গাটা ভুতুড়ে, রাতে কেউ ও পথে যায় না। সেদিন পাকিম পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। এক ঘন্টার পথ কিন্তু মনে হচ্ছিলো কত ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে।

রাস্তার ধারেই পাকিম প্যালেটাইন কলেজের সিঁড়ি নেমে গিয়েছে অধ্যাপকের ঘরে। দক্ষিণ ভারতীয় অধ্যাপক, স্থানীয় কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং বাঙালি সহ-অধ্যাপকের সামনে ইন্টারভিউ দিতে হলো। প্রধান জিজ্ঞাসা একটাই – এখানে থাকা যাবে তো? উত্তরে ‘না’ বলিনি। সে রাতে ফেরা হলো না শিলিগুড়িতে। এবার প্রশ্ন, কোথায় থাকবো? জানা গেলো একটি মাত্র হোটেল রয়েছে এই এলাকায়, নাম সিলভার লজ। সেখানেই রাত্রি যাপন অনেক অনিশ্চয়তা নিয়ে। রাতে হোটেলের জানলা থেকে দেখলাম তারাদের জ্বলে ওঠা পাহাড়ের গায়ে। দূরের গ্যাংটক শহরের আলোর রোশনাই। আর নিচের ছোট ছোট গ্রামের আলো। মন খারাপ, ভালো মেশানো অদ্ভুত এক অনুভূতি। জায়গাটা ভালো লেগে গেলো। পরের দিন ফিরলাম কথা দিয়ে যে আবার  আসবো বাক্স গুছিয়ে।


পরের মাসে যোগ দিলাম কলেজে। একটা বাড়ির চিলেকোঠার ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। ছাদের এক কোন দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথা উঁকি দিতো আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে। একটা গ্যাস স্টোভের ব্যবস্থা হয়েছিল। সপ্তাহে একদিন মাছ বা মাংস, তাছাড়া বেশিরভাগ সময় ডাল , তরকারি, ডিম  আর পাঁপড় দিয়ে চলে যেত। মাঝে মাঝে বাড়িওয়ালি দিদি রান্না করে দিতো তিলের সবজি। বেশ খেতে, কিন্তু খুব ঝাল। টিফিনে স্থানীয় দোকানের  মোমো, ম্যাগি বেশ চলতো। ধীরে ধীরে পাড়ার সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। বড় থেকে ছোট সবাই ‘মিস’ বলে ডাকত। বাড়ির ছোট্ট মেয়ে অন্নেষা ঘরে এসে বিস্কুট খেয়ে যেত। রাস্তা দিয়ে নেপালি ভাষায় গান করতে করতে যেত ময়লা চাচা।

Pakim

ছুটি থাকলে মন খারাপ হতো। ভাবতাম কী ভাবে সময় কাটবে। এক একদিন আমার পাহাড়ি বন্ধু কিরণের সঙ্গে চলে যেতাম গ্যাংটক শহরে। সারাদিন ঘুরে খেয়ে ফেরা। ঠিক ছুটির দিন যেভাবে কাটে। আবার কোনও সময় ওর বাড়িতেই থেকে যেতাম রাতে। ওরা সবাই মিলে মোমো বানাতো। সে এক জমজমাট ব্যাপার। ওই  স্বাদ  আর খুঁজে পাইনি। রবিবার দু’তিন সতীর্থ মিলে হাটতে যেতাম। কখনও কার্তো গুম্ফা, আবার কখনও গানজং গুম্ফায়। একবার ডিকলিং এ তো একটা ছোটোখাটো সার্ভে করে ফেললাম স্থানীয় মানুষদের নিয়ে।

একবার খুব বৃষ্টি হলো। ধস নামলো বাড়ির সামনে। রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল বেশ কয়েকদিনের জন্য। কিন্তু তাতে কি? আমার কর্ম ক্ষেত্র তো পাশের বাড়ি। পাহাড়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকতো মেঘ। শীত কালটা আবার খুব কষ্টের। কেউ থাকতো না। সবাই শিলিগুড়ি শহরে নেমে যেত ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে। কলেজে ছুটি থাকতো দু’মাস। কিন্তু একবার পরীক্ষার জন্য যেতে হয়েছিল। দু’দিন থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। তবে সেখানে গরমকাল বেশ মনোরম। মা আর দিদি যখন যেত দারুন কাটতো সময়। মায়ের হাতের রান্নাও খাওয়া যেত।

Pakim

দেখতে দেখতে ১০ মাস কেটে গেলো। অনেক বার ভেবেও বাড়ি বদল করতে পারিনি। আমাদের এক শিক্ষক বলতেন তোমার ঘরটা ঠিক যেন পাখির বাসা। সে বাসা ছেড়ে যখন বেরোলাম তখন পাকিয়ং আর অচেনা নেই। সবাই আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিল ওই ১০ মাসে। সে সময় ফেলোশিপ না পেলে হয়তো আজ ও থেকে যেতাম পাকিয়ংয়ের ওই পাখির বাসায়। আর সাক্ষী  থাকতাম সিকিমের একমাত্র বিমান বন্দর উদ্বোধনের। তবে সুযোগ পেলে, সিকিম বেড়াতে গেলে একবার চেষ্টা করি প্রিয় পাকিমকে দেখে আসার। চেনা মানুষগুলো একই রয়েছে। ভালবাসার টানটাও।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle