Sandpapergate Incident কীভাবে ধরা পড়েছিল ব্রডকাস্টারদের ক্য়ামেরায়, ৮ বছর পর চাঞ্চল্যকর তথ্য

Sandpapergate Incident

ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা ‘স্যান্ডপেপারগেট’ (Sandpapergate Incident)। ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কেপটাউন টেস্টে বলের আকৃতি পরিবর্তন করতে স্যান্ডপেপার ব্যবহার করার অভিযোগে ধরা পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ার তিন ক্রিকেটার। সেই ঘটনায় তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ, সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার এবং ক্যামেরন ব্যানক্রফ্টকে শাস্তি পেতে হয়েছিল।

ঘটনার আট বছর পর আবার সেই বিতর্ক সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে তিন টেস্টের সিরিজ খেলতে নামার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্প্রচারক আলভিন নাইকার জানিয়েছেন, কীভাবে একাধিক কাকতালীয় ঘটনার কারণে অস্ট্রেলিয়ার পরিকল্পনা টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে। তাঁর দাবি, গোটা ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পিছনে ছিল ‘absolute fluke’—অর্থাৎ একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত সৌভাগ্য।


কী ঘটেছিল সেদিন?

২০১৮ সালের কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনে লাঞ্চের সময় অস্ট্রেলিয়ার ‘লিডারশিপ গ্রুপ’ বলের উপর কারসাজি করার পরিকল্পনা করে বলে পরে স্বীকার করেছিলেন স্মিথ, ওয়ার্নার এবং ব্যানক্রফ্ট।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজটি তখন অত্যন্ত উত্তেজক অবস্থায় ছিল। প্রথম টেস্ট ডারবানে এবং দ্বিতীয় টেস্ট পোর্ট এলিজাবেথে একাধিক বিতর্ক ও উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেছিল। তবে সম্প্রচারকারী দলের কেউ তখনও ভাবেননি যে অস্ট্রেলিয়া বলের সঙ্গে কারসাজি করছে।

তৃতীয় টেস্টের সেই দিন বলটি উইকেটকিপারের হাতে যাওয়ার পর ব্যানক্রফ্ট বলটি পালিশ করতে শুরু করেন। প্রথমে তিনি নিজের প্যান্টে বল ঘষছিলেন। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তাঁর আচরণ বদলে যায়।

ক্যামেরাম্যানের নজরেই বদলে গেল সবকিছু

নাইকারের বর্ণনা অনুযায়ী, সাধারণত ক্রিকেট সম্প্রচারে বল অনুসরণ করাই ক্যামেরাম্যানের প্রধান কাজ। কিন্তু সেদিন একজন ক্যামেরাম্যান ব্যানক্রফ্টের উপর ক্যামেরা ধরে রাখেন।

ব্যানক্রফ্টকে দেখা যায় প্যান্টে বল ঘষার বদলে নিজের হাতের তালুতে বল ঘষছেন। এরপর তিনি হাতটি পকেটে ঢোকান।

সেই মুহূর্তে ক্যামেরাম্যান তাঁর ক্যামেরা আরও জুম করেন। স্লো-মোশন অপারেটর ফুটেজটি পিছিয়ে নিয়ে আবার দেখেন এবং আরও জুম করে দেখতে পান—ব্যানক্রফ্টের পকেটে একটি হলুদ রঙের বস্তু রয়েছে। পরে সেটিই স্যান্ডপেপার হিসেবে চিহ্নিত হয়।

Sandpapergate Incident

বড় পর্দায় ফুটেজ দেখানোতেই বিপদ

ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। সম্প্রচারকারী দল সেই ফুটেজ স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় দেখায়।

ব্যানক্রফ্ট নিজেই মাঠের বড় পর্দায় নিজের কর্মকাণ্ডের রিপ্লে দেখতে পান। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত সেই বস্তুটি সরিয়ে ফেলেন এবং নিজের অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন।

কিন্তু ততক্ষণে ক্যামেরায় গোটা ঘটনা রেকর্ড হয়ে গিয়েছে। সম্প্রচারটি সরাসরি না হলেও রিপ্লে হিসেবে তা দেখানো হচ্ছিল। বিশ্বজুড়ে দর্শকরাও ঘটনাটি দেখতে পান।

কীভাবে আম্পায়ারদের নজরে এল?

সম্প্রচারের পর বিষয়টি দ্রুত ম্যাচ কর্মকর্তাদের নজরে আসে। তৃতীয় আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড-ও ফুটেজ দেখতে শুরু করেন। নাইকার জানিয়েছেন, রিপ্লে নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও হয়েছিল।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার কোচ ড্য়ারেন লেম্য়ান ওয়াকিটকিতে দ্বাদশ খেলোয়াড় পিটার হ্য়ান্ডসকম্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হ্য়ান্ডসকম্ব মাঠে আসেন এবং এরপর আম্পায়ারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

অর্থাৎ, মাঠের আম্পায়াররা বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই টেলিভিশন ক্যামেরা গোটা ঘটনার ছবি ধরে ফেলেছিল।

‘কেউ আমাদের সতর্ক করেনি’

নাইকার জানিয়েছেন, প্রথম দুই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও সম্প্রচারকারী দলকে কেউ বলেনি যে অস্ট্রেলিয়ার বল টেম্পারিং নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যানক্রফ্টের উপর ক্যামেরা থেকে যাওয়াটাই ছিল মূল কাকতালীয় ঘটনা। অন্য ক্যামেরা হয়তো সেই সময় বল বা অন্য খেলোয়াড়কে অনুসরণ করছিল। কিন্তু ওই ক্যামেরাম্যান ব্যানক্রফ্টের উপর নজর রাখায় ঘটনাটি ধরা পড়ে যায়।

স্মিথ-ওয়ার্নারের স্বীকারোক্তি

ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। স্টিভ স্মিথ সংবাদ সম্মেলনে কেঁদে ফেলেন এবং বল টেম্পারিংয়ের পরিকল্পনার জন্য দায় স্বীকার করেন।

স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে ১২ মাস করে নিষিদ্ধ করা হয়। ব্যানক্রফ্টকে দেওয়া হয় ৯ মাসের নিষেধাজ্ঞা। স্মিথকে অধিনায়কত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

স্মিথ এবং ওয়ার্নার দু’জনকেই পরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ফিরে আসতে দেখা গেলেও, ঘটনাটি তাঁদের কেরিয়ারের অন্যতম বড় বিতর্ক হয়ে রয়েছে। তবে ফেরা হয়নি ব্য়ানক্রফ্টের।

আট বছর পর ফের দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ

২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়া ফের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে রয়েছে। দুই দল তিন টেস্টের সিরিজে মুখোমুখি হচ্ছে এবং সিরিজের প্রথম ম্যাচ ডারবানের কিংসমেডে-এ শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালের কেপটাউন কাণ্ডের পর এটিই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দুই দলের প্রথম টেস্ট সিরিজ।

বর্তমান অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও সেই ২০১৮ সালের টেস্টে দলের সদস্য ছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, পুরনো ঘটনাকে পিছনে ফেলে নিয়ে দল এগিয়ে গিয়েছে।

এই আবহেই দক্ষিণ আফ্রিকার সম্প্রচার সংস্থা সুপার স্পোর্ট মজার ছলে পুরনো স্যান্ডপেপার কাণ্ডের ফুটেজ সামনে এনে জানিয়েছে—এবারের তিন টেস্টের সিরিজেও তাদের ক্যামেরা যথেষ্ট সতর্ক থাকবে।

‘টেলিভিশনকে আর ফাঁকি দেওয়া যায় না’

নাইকারের-এর মতে, আধুনিক ক্রিকেটে অসদুপায় লুকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন। মাঠজুড়ে অসংখ্য ক্যামেরা, স্লো-মোশন রিপ্লে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকায় ক্রিকেটারদের প্রতিটি মুহূর্ত ধরা পড়তে পারে।

তাঁর বক্তব্যের মূল শিক্ষা একটাই—২০১৮ সালে যদি সেই ক্যামেরাম্যান ব্যানক্রফ্টের উপর আরও কয়েক সেকেন্ড নজর না রাখতেন, তাহলে হয়তো স্যান্ডপেপার কাণ্ড এত দ্রুত প্রকাশ্যে আসত না।

আর সেই কারণেই আট বছর পরও স্যান্ডপেপারগেটের গল্পে ‘সৌভাগ্যের কাকতালীয় মুহূর্ত’-টির গুরুত্ব এত বেশি।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google