Anxiety Disorders হচ্ছে কী দেখে বুঝবেন, তার প্রতিকারই বা কী

Anxiety Disorders

উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety Disorders) বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানসিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪৭ কোটি (৪৭০ মিলিয়ন) মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছিল। এই সংখ্যাটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে শনাক্ত করা এবং সময়মতো সহায়তা পাওয়ার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। উদ্বেগ সব বয়সের মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এর লক্ষণগুলো শৈশব বা কৈশোরেই দেখা দিতে শুরু করতে পারে। পুরুষ ও ছেলেদের তুলনায় মহিলা ও মেয়েদের মধ্যে উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি।

কোনও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, পরীক্ষা বা জীবনের বড় কোনও পরিবর্তনের আগে উদ্বিগ্ন বোধ করা স্বাভাবিক; কিন্তু ‘উদ্বেগজনিত ব্যাধি’ বিষয়টি তার চেয়েও গুরুতর। এতে এমন অত্যধিক ভয় বা উদ্বেগ কাজ করে যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, যা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, কাজ বা পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায়। উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া এবং পেশির টান বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো শারীরিক লক্ষণও দেখা দিতে পারে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে যে, উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকেন। উদ্বেগের বিভিন্ন ধরন এবং এর সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে মানুষ বুঝতে পারে কখন তাদের পেশাদার সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা সাধারণ উদ্বেগজনিত ব্যাধি (GAD)-এর ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কাজ, স্বাস্থ্য, পরিবার বা আর্থিক বিষয়সহ দৈনন্দিন নানা সমস্যা নিয়ে ক্রমাগত ও অত্যধিক দুশ্চিন্তা করেন। উদ্বেগের কোনও কারণ না থাকলেও বা কারণটি সামান্য হলেও তারা তাদের দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে পারেন।

এর সঙ্গে হতে পারে প্যানিক ডিজঅর্ডার। এতে বারবার ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা তীব্র আতঙ্কের আক্রমণ হতে পারে। এর ফলে হঠাৎ তীব্র ভয়ের পাশাপাশি হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুনরায় এমন আক্রমণের আশঙ্কায় ভয়ে ভয়ে থাকতে পারেন।

সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা সামাজিক উদ্বেগজনিত ব্যাধি নির্ভর করে তার আশপাশের মানুষের ওপর। সামাজিক পরিবেশে অন্যদের দ্বারা বিচার বা সমালোচনার শিকার হওয়া, বিব্রত হওয়া বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তীব্র ভয় থেকে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কথোপকথন, জনসমক্ষে কথা বলা বা সামাজিক জমায়েত এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেন। যাতে মানুষের থেকে দূরত্ব তৈরি হয়।

অ্যাগোরাফোবিয়া (Agoraphobia) আরও একটি সমস্যা যা সব পরিস্থিতি বা স্থান নিয়ে ভীতি কাজ করা যেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে অথবা প্যানিক অ্যাটাক হলে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে—একেই অ্যাগোরাফোবিয়া বলে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা জনাকীর্ণ স্থান, গণপরিবহন বা একা বাড়ি থেকে বের হওয়া এড়িয়ে চলতে পারেন। এর মধ্যে ক্লস্টোফোবিয়া বড় আকাড়ে দেখা দিতে পারে।

সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা বিচ্ছেদজনিত উদ্বেগ যা মানুষের মনের উপর বড় প্রভাব ফেলে। গভীর আবেগীয় বন্ধন রয়েছে এমন কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অত্যধিক ভয় থেকে এই সমস্যা তৈরি হয়। এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়কেই প্রভাবিত করতে পারে।

নির্দিষ্ট ফোবিয়া (Specific phobias) এমন একটি সমস্যা যা কোনও নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতি—যেমন উচ্চতা, পোকামাকড় বা বিমানে ভ্রমণ—নিয়ে তীব্র ভীতি কাজ করাকে নির্দিষ্ট ফোবিয়া বলা হয়। এক্ষেত্রে ভয়ের মাত্রা প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

উদ্বেগজনিত সমস্যা বা ‘অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার’ মানসিক ও শারীরিক—উভয় স্বাস্থ্যকেই প্রভাবিত করতে পারে। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হল সবসময় দুশ্চিন্তা করা। কোনও ব্যক্তি দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে বারবার দুশ্চিন্তা করতে পারেন বা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ ফলাফলের কথা ভাবতে পারেন। সমস্যা মিটে যাওয়ার পরেও এই দুশ্চিন্তা অব্যাহত থাকতে পারে। দ্বিতীয় উপসর্গ, মনোযোগের অভাব। মাথার ভেতর নানা চিন্তার ভিড় এবং ক্রমাগত দুশ্চিন্তার কারণে কোনও কাজে মনোযোগ দেওয়া, তথ্য মনে রাখা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অস্থিরতা ও খিটখিটে মেজাজ। মানুষ সবসময় এক ধরণের মানসিক চাপে বা অস্বস্তিতে থাকতে পারেন, সহজে শান্ত হতে পারেন না কিংবা ছোটখাটো বিষয়েও খিটখিটে হয়ে উঠতে পারেন। এছাড়া স্থির হয়ে বসে থাকাটাও তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

এর পাশাপাশি দেখা দিতে পারে শারীরিক লক্ষণও। উদ্বেগের কারণে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, শরীর কাঁপা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর সময় শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও হতে পারে। এর সঙ্গে ভীষণ স্বাভাবিকভাবে হতে পারে ঘুমের সমস্যা। ক্রমাগত দুশ্চিন্তার কারণে সহজে ঘুম না আসা বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার মতো সমস্যা হতে পারে। আর ঘুমের অভাব ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মানুষ এই সমস্যার মধ্যে পড়ার ভয়ে মানুষ বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলাটাও এর একটা বড় ইঙ্গিত। কোনও ব্যক্তি সামাজিক অনুষ্ঠান, জনসমাগমপূর্ণ স্থান কিংবা যেসব পরিস্থিতি তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দৈনন্দিন কাজকর্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অকারণে বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। কোনও স্পষ্ট বিপদ বা হুমকি না থাকা সত্ত্বেও মানুষের মনে হতে পারে যে খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ভয়ের এই তীব্র অনুভূতি নিরাপদ বোধ করা কঠিন করে তুলতে পারে।

এবার প্রাথমিকভাবে নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে এই সব সমস্যা থেকে নিজেকে বের করে আনতে। নিজের যত্ন নেওয়া বা ‘সেলফ-কেয়ার’ কখনওই পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না; তবে কিছু অভ্যাস উদ্বেগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে কিছু জিনিস অনুশীলন করতে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আনা যেতে পারে। দেখে নেওয়া যাক সেগুলো কী কী-

ধীর গতিতে শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চা করা। যখন অ্যাটাক হবে তখন নিজের শ্বাস নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধীর ও আরামদায়কভাবে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ার ওপর মনোযোগ দিন। উদ্বেগ বাড়লে শারীরিক উত্তেজনা বা মানসিক চাপ কমাতে বিভিন্ন ‘রিল্যাক্সেশন টেকনিক’ বা শিথিলকরণ পদ্ধতি সহায়তা করতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, যেমন প্রতিদিন অল্প সময় হাঁটাচলা করা, মানসিক সুস্থতা উন্নত করতে এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

সব থেকে যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল ঘুমের রুটিন মেনে চলা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। ভালো ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করে। যারা অ্যালকোহল সেবন করেন তাদের তার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। এসব উপাদান উদ্বেগের লক্ষণগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। বর্তমান মুহূর্তের ওপর মনোযোগ দিয়ে কয়েক মিনিট সময় কাটানো দুশ্চিন্তার চক্রে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিজেকে পছন্দের কোনও কাজে ব্যস্ত করার মতো ভালো বিকল্প কিছু হতে পারে না।

কোনও কিছুই কাজ না করলে পেশাদার সহায়তা নিতেই হবে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) মানুষকে ক্ষতিকর চিন্তার ধরন শনাক্ত করতে এবং উদ্বেগের মোকাবিলায় আরও স্বাস্থ্যকর উপায় গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া, ব্যক্তির উপসর্গ ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে একজন চিকিৎসক ওষুধের উপদেশও দিতে পারেন, যদি সমস্যা অনেক বেড়ে যায়।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google