Bolotana ইতালির এক রহস্য গ্রাম, যেখানে ৭০ পেরোলেই আয়ু পৌঁছে যায় সেঞ্চুরিতে

Bolotona

রহস্যে মোরা ইতালির এক ছোট্ট গ্রাম। যেখানে মহিলাদের ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বিশ্বের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের মহিলাদের তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এর রহস্য খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ, ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধন এবং শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্কের সমন্বয়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ইতালির সার্ডিনিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত বোলোতানা (Bolotana) গ্রামটি দীর্ঘায়ুর একটি সম্ভাব্য নতুন কেন্দ্রস্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে মানুষ অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ জীবন যাপন করে। গবেষকরা দেখেছেন যে, এই গ্রামের যে মহিলারা ৭০ বছর বয়সে পৌঁছান, ইতালি বা যুক্তরাষ্ট্রের মহিলাদের তুলনায় তাদের ১০০তম জন্মদিন উদযাপন করার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

গবেষণা অনুসারে, বোলোতানার ৭০ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে প্রায় ১৩.৮ শতাংশের ১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর তুলনায় ইতালির মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ৩.৬ শতাংশ।


এই গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে, বোলোতানা একটি নতুন “ব্লু জোন” হয়ে উঠতে পারে; এই শব্দটি এমন স্থানগুলোর জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে মানুষ ব্যতিক্রমী দীর্ঘায়ু লাভ করে। তবে, বিজ্ঞানীরা বলছেন, কী কারণে গ্রামটি এতটা ব্যতিক্রমী, তা নিশ্চিত করার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।

গবেষকরা প্রায় ২,৩০০ জন বাসিন্দা অধ্যুষিত এই গ্রামের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক নথি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার হার পরীক্ষা করেছেন, বিশেষ করে ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর মানুষ কতদিন বেঁচে ছিলেন তার উপর আলোকপাত করেছেন। এই গবেষণাপত্রটি যৌথভাবে রচনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় শিকাগো স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর এপিডেমিওলজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এস. জে ওলশানস্কি।

ওলশানস্কি বলেন, “বোলোতানাকে যা অসাধারণ করে তুলেছে তা হল এর অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক নথি, যা আমাদের জন্ম ও মৃত্যুর সময় বয়সকে সুনির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয়। পৌরসভা এবং ব্যাপটিজমের নথিগুলো শত শত বছর আগের এবং এগুলো আমাদের স্বাধীনভাবে বয়স যাচাই করার সুযোগ করে দিয়েছে।”

দলটি ১০০ বা তার বেশি বছর বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের বয়স যাচাই করার জন্য স্থানীয় সরকারি নথি এবং গির্জার আর্কাইভ ব্যবহার করেছে। গবেষকরা ১৯০০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে বোলোতানায় জন্মগ্রহণকারী ৩,০৬০ জনের মধ্যে ৩৮ জন শতবর্ষীকে নথিভুক্ত করেছেন।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বোলোতানায় মহিলারা ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরেও আনুমানিক আরও প্রায় ২১ বছর বেঁচে থাকেন। গবেষকরা এই গ্রামটিকে বিশ্বের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও তুলনা করেছেন। ৭০ বছর বয়সে অবশিষ্ট আয়ু এবং ১০০ বছর পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বোলোতানায় মহিলারা হংকংয়ের মহিলাদের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন।

ওলশানস্কি গ্রামের মহিলাদের মধ্যে দীর্ঘায়ুর এই অস্বাভাবিক ধারার ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, “বিশ্বের যেকোনও জায়গায় মহিলারা প্রায় সবসময়ই পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে, কিন্তু সার্ডিনিয়ায় ব্যাপারটা তেমন ছিল না। এটাই এটিকে এতটা অস্বাভাবিক করে তুলেছে। আমরা মনে করি, এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মহিলা জনগোষ্ঠী, বা তার কাছাকাছি।”

এই ফলাফলগুলো বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ দুই দশকেরও বেশি আগে চিহ্নিত সার্ডিনিয়ার মূল ‘ব্লু জোন’ পুরুষদের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘায়ুর জন্য পরিচিত ছিল। বোলোতানায়, মহিলারাই এই ব্যতিক্রমী দীর্ঘায়ু লাভের প্রধান চালিকাশক্তি বলে মনে হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস, হাঁটা এবং দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনই হতে পারে এর মূল কারণ। যদিও এই গবেষণাটি গ্রামবাসীদের দীর্ঘ জীবনের পেছনের সঠিক কারণগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, গবেষকরা এমন বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন যা এই ধারাটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে।

বোলোতানায় খাড়া রাস্তা এবং পাহাড় রয়েছে, যা বাসিন্দাদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হিসেবে হাঁটতে উৎসাহিত করে। এখানকার বেশিরভাগ খাবার স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ জলপাই তেল তৈরির জন্য ব্যবহৃত জলপাইও রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্প্রদায়ের সমর্থন এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়ে থাকতে পারে। এখানকার বাসিন্দারা প্রায়শই তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছাকাছি বসবাস করেন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি এখানে সচরাচর দেখা যায় না।

ওলশানস্কি বলেন, “এখানে একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সুসংহত সম্প্রদায় রয়েছে, যেখানে মানুষ একে অপরের দেখাশোনা ও খেয়াল রাখে। এখানকার মানুষের চলাফেরার প্রধান মাধ্যম হলো হাঁটা, গাড়ি চালানো নয়।”

গবেষকদের মতে, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ, পারিবারিক সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত প্রভাব গ্রামবাসীদের দীর্ঘায়ুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রতিটি উপাদানের গুরুত্ব বা প্রভাব ঠিক কতটা, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, বোলোতানা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে হয়তো বোঝা সম্ভব হবে কেন কিছু জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যদের তুলনায় বেশি সুস্থ থাকেন এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। এই গবেষণার ফলাফল থেকে দৈনন্দিন অভ্যাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় পরিবেশ কীভাবে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে, একই ধরনের জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করলেই দীর্ঘ জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।

ওলশানস্কি বলেন, “আমরা যদি এই দীর্ঘায়ুর পেছনের বৈশিষ্ট্যগুলো শনাক্ত করতে পারি এবং মানুষকে সেগুলো গ্রহণে সহায়তা করতে পারি, তবে এই সম্প্রদায়ের চর্চিত মূল্যবোধগুলো সম্পর্কে জেনে বিশ্বের অন্যান্য মানুষও উপকৃত হতে পারবে।”

৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিং’ (Frontiers in Ageing) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বোলোতানাকে একটি সম্ভাব্য নতুন ‘ব্লু জোন’ (Blue Zone) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘায়ুর এই প্রবণতার তীব্রতা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ছিল; তাই গ্রামটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ‘ব্লু জোন’ হিসেবে নিশ্চিত করার আগে আরও দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google