ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জগতে একটি স্বতন্ত্র নাম যোগেন চৌধুরী (Jogen Chowdhury)। তাঁর ছবির রেখা যেমন ছিল অনন্য, তেমনই তাঁর শিল্পে ফুটে উঠত মানুষের জীবন, যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা, সমাজের বৈপরীত্য এবং বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুভব। শুধু একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই নয়, শিক্ষক, শিল্প-সংগঠক, লেখক, শিল্প-সমালোচক এবং সাংসদ হিসেবেও তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিরল রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৪ মাস ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। রবিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে কলকাতার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
জন্ম ও শৈশব
যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ সালে, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার ডাহারপাড়া গ্রামে। বর্তমানে এই অঞ্চল বাংলাদেশের অন্তর্গত। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ব্যক্তি।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশে মায়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর মা বাংলার ঐতিহ্যবাহী আলপনা আঁকতেন। মায়ের সেই শিল্পকর্ম ছোট্ট যোগেনের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর ছবির রেখা ও অলঙ্করণে বাংলার লোকশিল্পের সেই প্রভাবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।
দেশভাগ বদলে দিল জীবন
১৯৪৭ সালের দেশভাগ যোগেন চৌধুরীর জীবনেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। দেশভাগ, স্থানান্তর, উদ্বাস্তুজীবন এবং মানুষের অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মানুষের শরীর, মুখ, ভঙ্গি এবং জীবনের অস্বস্তি তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর শিল্পে তাই শুধু সৌন্দর্য নয়, জীবনের কঠিন বাস্তবতাও জায়গা পেয়েছে।
কলকাতায় শিল্পশিক্ষা
কলকাতায় এসে তিনি ভর্তি হন Government College of Art and Craft-এ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন। এখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভিত তৈরি হয়।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। হাওড়া জেলা স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। এরপর তিনি সরকারি হ্যান্ডলুম বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হন এবং টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। কলকাতা ও পরে মাদ্রাজের Weavers’ Service Centre-এও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
প্যারিসে নতুন দিগন্ত
১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে যোগেন চৌধুরী প্যারিসে যান। সেখানে তিনি École Nationale Supérieure des Beaux-Arts-এ পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি William Hayter-এর Atelier 17-এও শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্যারিসের সময়টি তাঁর শিল্পজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় তাঁর শিল্পভাবনাকে আরও প্রসারিত করে। ১৯৬৬ সালে প্যারিসে তিনি Prix Le France de la Jeune Peinture পুরস্কার লাভ করেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এটিই তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্বীকৃতি।
তবে বিদেশি শিল্পের প্রভাব গ্রহণ করলেও তিনি নিজের শিকড় ভুলে যাননি। বরং ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালি শিল্প-সংস্কৃতির উপাদানকে মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেন।
নিজের শিল্পভাষার জন্ম
প্যারিস থেকে ফিরে যোগেন চৌধুরী এমন এক শিল্পভাষা তৈরি করেন, যা তাঁকে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলায় আলাদা করে চেনায়।
কালি, জলরং ও প্যাস্টেল ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় মাধ্যম। তাঁর ছবির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে বাঁকানো রেখা, ঘন ক্রস-হ্যাচিং, বিকৃত মানবদেহ এবং তীব্র অভিব্যক্তি।
তাঁর আঁকা মানুষ কখনও ক্লান্ত, কখনও বিষণ্ণ, কখনও অস্বস্তিতে থাকা, কখনও বা রহস্যময়। মানুষের শরীরকে তিনি শুধু সৌন্দর্যের বস্তু হিসেবে দেখেননি; শরীরের মধ্য দিয়েই মানুষের মানসিক অবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন।
তাঁর রেখা কখনও শরীরের লোমের মতো, কখনও শিরার মতো, আবার কখনও যেন জীবনের জটিলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। রঙের ব্যবহারও ছিল পরিমিত; রেখা এবং আকৃতিই তাঁর ছবির মূল শক্তি।
রাষ্ট্রপতি ভবনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি শিল্প-সংগ্রহের সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনের Keeper of Art বা শিল্পকর্মের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতি ভবনের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার এই সময় তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
শান্তিনিকেতন ও শিক্ষকতা
১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনের দায়িত্ব শেষ করে তিনি বিশ্বভারতীর কলাভবনে যোগ দেন। সেখানে তিনি পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন এবং পরবর্তীকালে প্রফেসর এমেরিটাস হন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আলাদা। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ এবং শিল্প নিয়ে মুক্ত আলোচনা তাঁকে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কলকাতার পাশাপাশি শান্তিনিকেতন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা হয়ে ওঠে। শান্তিনিকেতনের লাল মাটি, প্রকৃতি ও পরিবেশও তাঁর শিল্পচর্চায় প্রভাব ফেলেছিল।
দেশ-বিদেশে প্রদর্শনী
যোগেন চৌধুরীর ছবি শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রদর্শনীতে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।
হাভানা বিয়েনালে, সাও পাওলো বিয়েনালে, লন্ডনের Festival of India, জাপান, আমেরিকা, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, জার্মানি-সহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁর কাজ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহেও স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে National Gallery of Modern Art, Rashtrapati Bhavan, Victoria & Albert Museum এবং Singapore Art Museum।
পুরস্কার ও সম্মান
দীর্ঘ শিল্পজীবনে যোগেন চৌধুরী বহু পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মানগুলির মধ্যে রয়েছে—
- Prix Le France de la Jeune Peinture, Paris — ১৯৬৬
- Havana Biennale, Cuba — ১৯৮৬
- Kalidas Samman — ২০০১
- Banga Bibhushan — ২০১২
- বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প সম্মান
মধ্যপ্রদেশ সরকারের দেওয়া কালিদাস সম্মান তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মানেও ভূষিত করে।
শিল্পের পাশাপাশি লেখালেখি
যোগেন চৌধুরী শুধু ক্যানভাসে শিল্পচর্চা করেননি। তিনি শিল্প নিয়ে লিখেছেন এবং বাংলা ভাষায় বইও প্রকাশ করেছেন। রাজ্যসভার জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও তাঁর লেখার পরিকল্পনা ছিল।
সংসদে বসেও তিনি সহকর্মীদের স্কেচ করতেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সীতারাম ইয়েচুরি, স্মৃতি ইরানি, জাভেদ আখতার-সহ বহু পরিচিত ব্যক্তিত্ব তাঁর আঁকা স্কেচে উঠে এসেছে। এই স্কেচগুলিকে কেন্দ্র করে তাঁর ‘রাজ্যসভা ডায়েরি’ প্রকাশের পরিকল্পনাও ছিল।
রাজনীতিতে যোগ
২০১৪ সালে যোগেন চৌধুরী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং ৩ এপ্রিল ২০১৪ থেকে ২ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন।
তাঁর রাজনীতিতে আসা ছিল অন্য অনেক রাজনীতিকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি মূলত শিল্পী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সংসদে থেকেও শিল্পীসত্তাকে কখনও দূরে সরিয়ে রাখেননি। সংসদ ভবনের করিডর ও অধিবেশনের ফাঁকে সহকর্মীদের স্কেচ করার ছবি এবং গল্প তাঁর সাংসদজীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
বাংলার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
যোগেন চৌধুরীর শিল্পে বাংলার প্রভাব ছিল গভীর। দেশভাগের স্মৃতি, গ্রামবাংলা, মানুষের শরীর, লোকশিল্প, সামাজিক বৈপরীত্য এবং বাঙালির দৈনন্দিন জীবন তাঁর শিল্পের বিভিন্ন স্তরে উঠে এসেছে।
তাঁর শিল্পে একদিকে ছিল আন্তর্জাতিক আধুনিকতার ছাপ, অন্যদিকে ছিল বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ। এই দুইয়ের মেলবন্ধনই তাঁকে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলায় স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।
শেষ জীবন
জীবনের শেষ পর্বেও শিল্পচর্চা এবং শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। তিনি কলকাতা ও শান্তিনিকেতনের মধ্যে জীবন কাটাতেন। বয়স বাড়লেও তাঁর শিল্প নিয়ে আগ্রহ এবং শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল।
২০২৫ সাল থেকে তিনি রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। প্রায় ১৪ মাস অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। সেপসিস ও অন্যান্য জটিলতাও দেখা দেয় এবং শেষপর্যন্ত তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
প্রয়াণে শূন্যতা
২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার সকালে তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় শিল্পজগতে নেমে আসে শোকের ছায়া। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শিল্পী সমীর আইচ-সহ বহু শিল্পী ও সংস্কৃতিজন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা মনে করেন, যোগেন চৌধুরীর মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, ভারতীয় আধুনিক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান।
যোগেন চৌধুরী: একটি দীর্ঘ উত্তরাধিকার
যোগেন চৌধুরীর জীবনকে শুধু জন্ম, পড়াশোনা, চাকরি, পুরস্কার বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর আসল পরিচয় তাঁর রেখায়।
যে রেখা দিয়ে তিনি মানুষের মুখ এঁকেছেন, সেই রেখার মধ্যেই ধরা পড়েছে মানুষের ভয়, একাকিত্ব, আকাঙ্ক্ষা, ক্লান্তি এবং বেঁচে থাকার লড়াই। তাঁর শিল্পে ভারতীয় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য সংলাপ তৈরি হয়েছিল।
একদিকে ফরিদপুরের শৈশব, দেশভাগের স্মৃতি ও কলকাতায় বেড়ে ওঠা; অন্যদিকে প্যারিসের আধুনিক শিল্পচর্চা, রাষ্ট্রপতি ভবনের দায়িত্ব, শান্তিনিকেতনের শিক্ষকতা এবং রাজ্যসভার সাংসদজীবন—সব মিলিয়ে যোগেন চৌধুরীর জীবন ছিল বহুমাত্রিক।
তাঁর হাতে কালি, জলরং ও প্যাস্টেল শুধু ছবি আঁকার মাধ্যম হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল মানুষের অন্তর্জগতকে প্রকাশ করার ভাষা।
শিল্পী যোগেন চৌধুরী চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর আঁকা রেখা, তাঁর শিল্পভাবনা এবং তাঁর তৈরি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
