র্যাবিস (Rabies) বা জলাতঙ্ক একটি গুরুতর ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা আক্রান্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। তবে আঁচড় বা এমন ক্ষত, যেখানে আক্রান্ত প্রাণীর লালা লাগার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখান থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায় র্যাবিস?
র্যাবিস ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালায় থাকে। আক্রান্ত প্রাণী কামড়ালে তার লালার মাধ্যমে ভাইরাস ক্ষতস্থানে প্রবেশ করতে পারে। কুকুর র্যাবিস সংক্রমণের অন্যতম পরিচিত উৎস হলেও বিড়াল, বাদুড়, শিয়াল, বেজি এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে।
শুধু কামড় নয়, আঁচড়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাণীর নখে লালা লেগে থাকলে এবং সেই আঁচড়ে ত্বক কেটে গেলে সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কামড় বা আঁচড়ের পর প্রথম কাজ কী?
আক্রান্ত প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড়ালে বিষয়টি হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। প্রথমেই ক্ষতস্থানটি সাবান ও প্রচুর পরিষ্কার জল দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
ক্ষতস্থান ধোয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় র্যাবিস টিকা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (RIG) দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কোন ব্যক্তির কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তা কামড়ের ধরন, ক্ষতের অবস্থান এবং প্রাণীটির পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসক ঠিক করেন।
প্রাণীটি পোষ্য হলেও কি ঝুঁকি থাকে?
পোষ্য কুকুর বা বিড়াল হলেও কামড় বা আঁচড়কে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রাণীটির র্যাবিস টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, তার আচরণে অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না এবং চিকিৎসকের মূল্যায়ন—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
কোনও প্রাণী কামড়ানোর পর সেটিকে নিজের সিদ্ধান্তে মেরে ফেলা বা চিকিৎসা না নিয়ে শুধু পর্যবেক্ষণ করা উচিত নয়। স্থানীয় পশুচিকিৎসা কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
র্যাবিসের উপসর্গ কী?
র্যাবিসের উপসর্গ দেখা দিতে কিছু সময় লাগতে পারে। শুরুতে জ্বর, দুর্বলতা, মাথাব্যথা এবং কামড়ের জায়গায় ব্যথা, ঝিনঝিন বা অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
পরবর্তীতে রোগটি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। তখন অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত উত্তেজনা, গিলতে সমস্যা, জল দেখলে বা পান করার চেষ্টা করলে গলার পেশিতে খিঁচুনি, অতিরিক্ত লালা পড়া এবং পক্ষাঘাতের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
উপসর্গ শুরু হলে বিপদ কেন বেশি?
র্যাবিসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল—উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। তাই উপসর্গের অপেক্ষা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
অন্যদিকে, প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত যথাযথ post-exposure prophylaxis (PEP) নেওয়া হলে র্যাবিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কোনও প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে র্যাবিস প্রতিরোধ করা যায়?
র্যাবিস প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—
- পোষ্য কুকুর-বিড়ালের নিয়মিত র্যাবিস টিকাকরণ।
- অচেনা বা পথপ্রাণীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ না হওয়া।
- শিশুদের প্রাণীর সঙ্গে নিরাপদ আচরণ শেখানো।
- প্রাণীর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে দূরে থাকা।
- কামড় বা আঁচড় লাগলে দ্রুত ক্ষতস্থান ধুয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া র্যাবিসের টিকার কোর্স বন্ধ না করা।
শেষ কথা
র্যাবিস এমন একটি রোগ, যেখানে সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। কোনও প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে ছোট ঘটনা মনে করে অপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ক্ষতস্থানে প্রাণীর লালা লাগার সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মনে রাখতে হবে, র্যাবিসের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত কম, কিন্তু তার আগে সঠিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
