Laika-কে মনে আছে? পৃথিবীর কক্ষপথে যাওয়া প্রথম প্রাণীর করুণ ইতিহাস

মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে ৩ নভেম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৫৭ সালের এই দিনেই সোভিয়েত ইউনিয়ন Sputnik 2 মহাকাশে পাঠায়। সেই মহাকাশযানের ভিতরে ছিল একটি ছোট্ট কুকুর—লাইকা (Laika)। পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছনো প্রথম প্রাণী হিসেবে লাইকার নাম ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।তবে লাইকার এই ঐতিহাসিক যাত্রার পিছনে ছিল এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক সত্য। তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কোনও ব্যবস্থা Sputnik 2-এ ছিল না।

১৯৫৭ সালে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলছিল তীব্র মহাকাশ প্রতিযোগিতা। ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ Sputnik 1 উৎক্ষেপণ করে।


এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর আরও বড় চমক দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। নভেম্বর বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি নতুন মহাকাশযান উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবার সেই মহাকাশযানে কোনও মানুষ নয়, একটি জীবন্ত প্রাণীকে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। সেই লক্ষ্যে দ্রুত তৈরি করা হয় Sputnik 2।

লাইকা কোনও দামী জাতের পোষ্য কুকুর ছিল না। সে ছিল মস্কোর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটি ছোট আকারের মিশ্র জাতের কুকুর।

মহাকাশ অভিযানের জন্য রাস্তার কুকুর বেছে নেওয়ার পিছনে বিজ্ঞানীদের একটি যুক্তি ছিল। কঠিন পরিবেশে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ছোট আকারের কারণে এই ধরনের কুকুরকে মহাকাশ অভিযানের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল।

লাইকার আসল নাম ছিল Kudryavka। পরে সে ‘Laika’ নামে পরিচিত হয়।

তার সঙ্গে আরও কয়েকটি কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ছোট জায়গায় দীর্ঘ সময় থাকা, শব্দ, কম্পন এবং তীব্র চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত লাইকা নির্বাচিত হয়।

লাইকার জন্য মহাকাশযানের ভিতরে তৈরি করা হয়েছিল একটি ছোট চাপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন। তার শরীরে লাগানো হয়েছিল বিভিন্ন সেন্সর, যার মাধ্যমে পৃথিবীতে বসে বিজ্ঞানীরা তার হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। অক্সিজেন, খাবার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু ছিল না সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি—পৃথিবীতে ফেরার ব্যবস্থা।

Sputnik 2-কে দ্রুত তৈরি করতে হয়েছিল এবং সেই সময়ের প্রযুক্তিতে প্রাণীকে কক্ষপথে পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।

৩ নভেম্বর সেই দিন যেদিন Sputnik 2 উৎক্ষেপণ করা হয়। রকেট মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে দেয়। লাইকা হয়ে যায় পৃথিবীর কক্ষপথে যাওয়া প্রথম প্রাণী।

উৎক্ষেপণের সময় প্রচণ্ড শব্দ, কম্পন ও ত্বরণের কারণে লাইকার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কিন্তু মহাকাশযান কক্ষপথে পৌঁছনোর পর পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে শুরু করে।

মানবজাতি প্রথমবারের মতো জানতে পারে, একটি জীবন্ত প্রাণী পৃথিবীর কক্ষপথে টিকে থাকতে পারে।

লাইকার মৃত্যুকে ঘিরে বহু বছর ধরে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমদিকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, লাইকা কয়েক দিন মহাকাশে বেঁচে ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বাস্তব ঘটনা ছিল অনেক বেশি মর্মান্তিক।

Sputnik 2-এর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। ফলে মহাকাশযানের ভিতরে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।

পরবর্তীকালে সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা জানান, উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অতিরিক্ত তাপ ও চাপের কারণে লাইকার মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

অর্থাৎ লাইকার মিশন ছিল দীর্ঘ কয়েক দিনের নয়—সম্ভবত মাত্র কয়েক ঘণ্টার।

লাইকার যাত্রা বিজ্ঞানীদের সামনে মহাকাশে জীবন্ত প্রাণীর শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দরজা খুলে দেয়। এরপর সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি তৈরির দিকে মন দেন যাতে মহাকাশে পাঠানো প্রাণীদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়।

১৯৬০ সালে Belka এবং Strelka নামে দুই কুকুরকে মহাকাশে পাঠানো হয় এবং তারা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

পরবর্তী সময়ে মানুষের মহাকাশযাত্রার পথ আরও প্রশস্ত হয়। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান।

লাইকা শুধু মহাকাশে যাওয়া প্রথম প্রাণী নয়। তার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং প্রাণী ব্যবহারের নৈতিক প্রশ্ন।

মানুষ মহাকাশে পৌঁছনোর পথে লাইকার মতো প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেই পরীক্ষাগুলি পরবর্তী মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও লাইকার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—তার পৃথিবীতে ফেরার কোনও সুযোগই ছিল না।

তাই ৩ নভেম্বরের ইতিহাসে লাইকার নাম একদিকে যেমন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক, অন্যদিকে তেমনই একটি করুণ স্মৃতি।

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর একটি ছোট্ট পথকুকুর পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছিল। সে আর পৃথিবীতে ফিরে আসেনি। কিন্তু তার নাম মহাকাশ ইতিহাসে চিরকাল থেকে গেছে—লাইকা।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google