West Bengal Govt: কেউ চেয়েছিল লন্ডন বানাতে, কেউ বানাতে চায় ব্যাংকক

শহরের ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, হকারদের জন্য পরিকল্পিত ব্যবসার জায়গা তৈরি এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও নাগরিক পরিকাঠামোয় সাজিয়ে তোলার লক্ষ্যে বড়সড় উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার (West Bengal Govt)। কলকাতা, হাওড়া ও বিধাননগর এলাকায় ব্যাংককের আদলে আধুনিক হকার জোন তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, ট্যাংরার চায়না টাউন, গঙ্গার দুই পাড়, চন্দননগর এবং নবদ্বীপ-মায়াপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির উন্নয়নেও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। কেউ চেয়েছিল লন্ডন বানাতে, কেউ চায় ব্যাংকক, আসল কথা রাজ্যকে সুন্দর করে তোলা সে যে দেশকেই মডেল করা হোক না কেন।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল বিল্ডিংস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (NBCC)-এর সঙ্গে মোট ন’টি সমঝোতাপত্র বা মউ স্বাক্ষর করেছে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। নগরোন্নয়ন ও পুরবিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে NBCC-কে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


ব্যাংকক মডেলে তৈরি হবে হকার জোন

কলকাতা, হাওড়া ও বিধাননগরের ফুটপাতগুলিকে আরও চলাচলের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও মাথায় রাখতে চাইছে রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যেই ব্যাংককের আদলে পরিকল্পিত হকার জোন তৈরির ভাবনা নেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় হকারদের বসিয়ে দেওয়াই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। আধুনিক ফুড স্ট্রিট, ফুড কোর্ট, অস্থায়ী বাজার এবং বিশেষ ধরনের খাবারের গাড়ি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। নির্দিষ্ট জায়গায় এই ধরনের ব্যবসার পরিকাঠামো তৈরি করা হতে পারে। এমনকী, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টেন্টের মাধ্যমে অস্থায়ী বাজার বসানোর ভাবনাও রয়েছে।

হকারদের কাছ থেকে ভাড়া সংগ্রহ এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে QR কোড-ভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন ফুটপাথের উপর চাপ কমবে, অন্যদিকে হকারদের ব্যবসার জন্যও নির্দিষ্ট পরিসর তৈরি হবে।

নতুন রূপ পাবে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া

কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এলাকা কলেজ স্ট্রিট। বইপাড়া হিসেবে শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশেই এর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দেশ-বিদেশের বইপ্রেমীদের কাছে কলেজ স্ট্রিট একটি বিশেষ আকর্ষণ।

এই এলাকার ঐতিহ্য ও নিজস্ব পরিচিতি অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাস্তা, পথচারীদের চলাচল, ব্যবসার পরিবেশ এবং সামগ্রিক নাগরিক পরিষেবার উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহাসিক চরিত্র যাতে কোনওভাবেই নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখার কথা জানিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ট্যাংরার চায়না টাউনেও বড় পরিবর্তনের ভাবনা

কলকাতার ট্যাংরার চায়না টাউন দেশের অন্যতম পরিচিত চিনা জনপদ। এখানকার খাবার, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং চিনা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের বসবাস এই এলাকাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।

এই চায়না টাউনকেও নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের। তবে আধুনিকীকরণের নামে এলাকার নিজস্ব চিনা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নষ্ট করতে চায় না সরকার। বরং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ট্যাংরাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

গঙ্গার দুই পাড়ে মেরিন ড্রাইভের আদলে সৌন্দর্যায়ন

এই গোটা পরিকল্পনার অন্যতম বড় আকর্ষণ গঙ্গার দুই পাড়ের উন্নয়ন। কলকাতা ও হাওড়া সংলগ্ন গঙ্গার তীরবর্তী এলাকাকে মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভের আদলে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে চার লেনের রাস্তা, পথচারীদের জন্য পৃথক ওয়াকওয়ে, সাইকেল চালানোর জন্য বিশেষ ট্র্যাক এবং আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা তৈরির ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি হোটেল, অফিস এবং বাণিজ্যিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ডায়মন্ড হারবার থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত গঙ্গার দুই পাড়ের সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি নদীর নীচ দিয়ে মেট্রো সংযোগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। এই বৃহত্তর পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রীর দফতরকেও জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ, রেল, পূর্ত দফতর, পরিবহণ দফতর-সহ একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির অনুমোদন ও সহযোগিতার উপর।

চন্দননগর ও নবদ্বীপ-মায়াপুরেও উন্নয়নের ছোঁয়া

কলকাতার বাইরে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলিকেও এই উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। চন্দননগরের গঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ফরাসি উপনিবেশের ঐতিহ্য বহনকারী এই শহরের নদীতীরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

অন্যদিকে, নবদ্বীপ ও মায়াপুরকে কেন্দ্র করে পর্যটন এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্নত পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে মায়াপুরে প্রতি বছর বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভক্তের সমাগম হয়। তাঁদের যাতায়াত, নাগরিক পরিষেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। নবদ্বীপের নদীর ঘাটগুলির উন্নয়নও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

বস্তি পুনর্বিকাশ ও সরকারি আবাসনের আধুনিকীকরণ

শুধু সৌন্দর্যায়ন নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কলকাতার বস্তি এলাকাগুলির পুনর্বিকাশ করে বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরনো বস্তি এলাকার পরিকাঠামো উন্নত করে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।

পাশাপাশি বিধাননগর পুরনিগম এলাকার পুরনো সরকারি আবাসনগুলির পুনর্বিকাশের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। কোথায় কী ধরনের আধুনিক আবাসন তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে সমীক্ষা ও পরিকল্পনা তৈরির কাজ হবে।

এ ছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় আধুনিক গণশৌচালয় তৈরির বিষয়টিও এই ন’টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে।

বিদেশের শহর থেকে শিক্ষা, বাংলার নিজস্ব পরিচিতি বজায় রেখেই উন্নয়ন

রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগে লন্ডন, ফ্রান্স, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক শহরের উন্নয়ন মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনও শহরের আদল হুবহু নকল না করে বাংলার নিজস্ব চাহিদা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকাঠামো গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। বিদেশের শহরগুলির ভালো দিকগুলি গ্রহণ করে বাংলার উপযোগী করে সেগুলি বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।

কবে শুরু হবে কাজ?

ন’টি মউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে মূলত প্রকল্পগুলির পরিকল্পনা, সমীক্ষা, নকশা তৈরি এবং বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হল। বিভিন্ন পুরসভা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে NBCC এই প্রকল্পগুলিতে কাজ করবে।

তবে প্রকল্পগুলির নির্দিষ্ট সময়সীমা, মোট ব্যয় এবং প্রতিটি কাজের বাস্তবায়নের পর্যায় সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত ঘোষণা হয়নি।

সব মিলিয়ে কলকাতা ও আশপাশের শহরগুলির নাগরিক পরিকাঠামো বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে বড় পরিকল্পনা সামনে আনল রাজ্য সরকার। কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহ্য রক্ষা, ট্যাংরার চায়না টাউনের আধুনিকীকরণ, হকারদের পুনর্বাসন, গঙ্গার দুই পাড়ের সৌন্দর্যায়ন থেকে শুরু করে মায়াপুরের পর্যটন পরিকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটানোই এখন সরকারের লক্ষ্য। পরিকল্পনাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত রূপ পায়, সেদিকেই নজর থাকবে কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যের মানুষের।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google