সুচরিতা সেন চৌধুরী: মনবীরের অভাবনীয় গোল মিস দেখে ডাগআউটে হাঁটু গেড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন মোহনবাগান কোচ দিমপেরিস। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এই গোল মিস করতে ঠিক কী প্রতিভা লাগে। তিনি একা নন, এই তালিকা দীর্ঘ হল ম্যাচ এগনোর সঙ্গে সঙ্গে। ম্যাচের ২০ সেকেন্ড থেকেই আক্রমণের শুরু। ওড়িশা বক্সে পর পর হানা মোহনবাগানের। কিন্তু গোল পেতে লেগে গেল ৪৭ মিনিট। একটার পর একটা মিসে যা বহর দেখালেন সবুজ-মেরুন ফুটবলাররা তাতে সেখানেই আত্মবিশ্বাসের দফারফা হয়ে যাওয়া কথা। সেই তালিকায় আরউইন থেকে লিস্টন, সবাই নাম লিখিয়ে ফেললেন। পর পর সুযোগ নষ্ট। তার মধ্যেই সুযোগ তৈরি করল ওড়িশা এফসিও। তারাও সুযোগ নষ্টের তালিকায় জায়গা করে নিল একইভাবে। গোল নষ্টের প্রদর্শনী চলল প্রথমার্ধের প্রায় পুরো সময়টাই জুড়ে। দ্বিতীয়ার্ধে হল পাঁচ গোল। দুই গোলের নিচে বিশাল কেইথ ও ঋত্বিক তিওয়ারি না থাকলেও অন্যরকম হতে পারত। যদিও শেষ হাসি হাসল মোহনবাগান কষ্টার্জিত জয়ের সঙ্গেই। তবে এই মিসের বহর দীর্ঘ আইএসএল ২০২৬-২৭ (ISL 2026-27)-এ চিন্তায় রাখবে পানাজিওটিস দিপেরিসকে।
২০ সেকেন্ডে নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট দিয়ে শুরু লি আরউইনের। দ্রাজিচের পাস থেকে তিনগজ বক্সের মধ্যে থেকে এমন মিস দিয়ে ম্যাচ শুরু হলে যা হয়। তা চলল পুরো প্রথমার্ধটাই। শেষ পর্যন্ত মিসের হিসেব রাখাটাই দুস্কর হয়ে উঠেছিল। ১১ মিনিটে মনবীরের ব্যাকপাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে জেলকোভিচের শট অল্পের জন্য বাইরে গেল। এর ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ওড়িশার কর্নার থেকে ক্লিয়ার হওয়া বল ধরে কাউন্টার আক্রমনে উঠে গিয়েছিলেন দেজান দ্রাজিচ। মাঝ মাঠ থেকেই ক্রস করেছিলেন লিস্টনকে লক্ষ্য করে কিন্তু তিনি যথারীতি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন।
এই গোল মিসের ম্যাচে বিতর্ক তৈরি করার জন্য নিশ্চিত বক্সের মধ্যে দু’বার হ্যান্ডবলকে রেফারির গুরুত্ব না দেওয়া অবশ্যই থাকবে। তাতে খানিকটা উত্তেজনাও তৈরি হল। দু’বারই মোহনবাগানের শট হাতে লাগালেন সৌরভ ভাওয়াল। এর মধ্যেই সুযোগ তৈর করল ওড়িশা এফসিও। ২৬ মিনিটে এভার্টনের গোলমুখি শট বাঁচিয়ে দেন বিশাল। ৩৪ মিনিটে মেহতাবের দূরপাল্লার শট বাচান ওড়িশা গোলকিপার ঋত্বিক তিওয়ারি। ভুলও করেন তিনি, তবে তার সুযোগ নিতে পারনি মোহনবাগান। ৪১ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে থ্রু বল ধরে বক্সের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন মনবীর সিং। জায়গা ছোট করতে গোল ছেড়ে এগিয়ে এসেছিলেন ঋত্বিক, কিন্তু নিজের লক্ষ্যে সফল হননি তিনি। কিন্তু ফাঁকা গোল পেয়েও জালে বল জড়াতে পারলেন না মনবীর। হতাশায় মাঠে বসে পড়লেন কোচ। এর পরও চলল গোল নষ্টের প্রতিযোগিতা। বিরতি যাওয়ার আগে জোড়া সুযোগ নষ্ট করলেন লিস্টন ও আরউইন। ৪৪ মিনিটে লিস্টনের শট ফাঁকা গোলে যাওয়ার বদলে পোস্টে লেগে ফিরল ফিরতি বলে আরউইনের শট বাঁচিয়ে দেন ঋত্বিক। একডজন গোলের সুযোগ নষ্ট করে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোলের মুখ খুলল মোহনবাগান। বোঝা গেল দলের ফরোয়ার্ডদের ড্রেসিংরুমে ভোকাল টনিকে দিয়েছেন কোচ। যে কারণে ৪৭ মিনিটে থাপার পাস থেকে দ্রাজিচের অসাধারণ ফিনিশিংয়ে এগিয়ে যায় মোহনবাগান। এই একবার পরাস্ত হলন ঋত্বিক তিওয়ারি, না হলে পুরো ম্যাচেই অসাধারণ গোলকিপিং করলেন তিনি। তবে মোহনবাগানের এগিয়ে যাওয়ার উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। কারণ পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সমতায় ফিরল ওড়িশা এফসি। নিহালের ক্রস থেকে মহম্মদ ইদের গোল প্রমান করল দিমপেরিসের ভোকাল টনিক কাজে দেয়নি ডিফেন্ডারদের। কারণ গোল হজম করতে হল রক্ষণের ভুলের জন্যই।
যখন লিস্টনই এদিন সেরা ফুটবলটা খেলছিলেন আর অন্যদিক সব থেকে অফফর্ম ছিলেন মনবীর সিং সেখানে লিস্টনকে তুলে ছাংতেকে নামিয়ে মনবীরকে মাঠে রেখে দিয়ে গোল মিসের তালিকা দীর্ঘ করা ছাড়া আর কিছুই হল না। মনবীর গোল মিস করে গেলেন আর ওড়িশা এফসি মোহনবাগান রক্ষণের ভুলের সুযোগ নিয়ে দু’বার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরল। ১-১ থেকে ৭৪ মিনিটে বক্সের ডান দিক থেকে বক্সের মধ্যে বল রেখেছিলেন ছাংতে। সেই বল বাঁদিকে ধরে বক্সের মধ্যে থেকেই গোলে শট নেন দ্রাজিচ। জোড়া গোলে নাম লিখিয়ে ফেললেন মোহনবাগানের এই বিদেশি। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হল না। কারণ ৭৯ মিনিটে আবারও মোহনবাগান রক্ষণের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করে যান ওড়িশার এভার্টন।
২-২ হয়ে যাওয়ার পর চোট সারিয়ে ফেরা জেমি ম্যাকলারেনকে নামান মোহনবাগান কোচ। তবে ৮৫ মিনিটে নেমে তিনি কিছু করার সুযোগ পাননি। বরং মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন লি আরউইন। ৮৭ মিনিটে বক্সের ডান দিক থেকে শুভাশিস বোসের লম্বা ক্রস ধরে আরউইনের ফিনিশের সঙ্গেই ৩-২ গোলে এগিয়ে যায় মোহনবাগান। আর এর সঙ্গেই খেলার ফলও লেখা হয়ে যায়। তবে এটা বলতেই হচ্ছে, জয় আসছে কিন্তু ভরসা আসছে কোথায়? পর পর চার ম্যাচ জিতে লিগ টেবলের শীর্ষস্থান ধরে রাখল মোহনবাগান।
মোহনবাগান: বিশাল কেইথ, মেহতাব সিং, টেকচাম অভিষেক সিং, আলবার্তো রডরিগেজ, শুভাশিস বোস, অনিরুদ্ধ থাপা, সমীর জেলকোভিচ (দীপক টাংরি), মানবীর সিং (জেমি ম্যাকলারেন), দেজান দ্রাজিচ, লিস্টন কোলাসো (লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে), লি হ্যারি আরউইন
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
