দীপাবলি মানেই নতুন সূচনা, সমৃদ্ধি ও লক্ষ্মীলাভের প্রত্যাশা। আর সেই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারের বিশেষ মুহরত ট্রেডিং (Diwali Muhurat Trading)। প্রতি বছর দীপাবলির শুভক্ষণে অল্প সময়ের জন্য খুলে যায় দেশের শেয়ার বাজার। বহু বিনিয়োগকারী এই দিনে নতুন করে শেয়ার কেনেন, কেউ আবার পুরনো পোর্টফোলিওতে নতুন বিনিয়োগ যোগ করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, মুহরত ট্রেডিং মূলত একটি ঐতিহ্য ও প্রতীকী সূচনা। এটি কোনও নিশ্চিত মুনাফার সুযোগ নয়। তাই আবেগের বশে নয়, বরং পরিকল্পনা ও আর্থিক বিচক্ষণতার সঙ্গে বিনিয়োগ করাই সবচেয়ে জরুরি।
মুহরত ট্রেডিং কী? কেন এই বিশেষ আয়োজন?
ভারতের শেয়ার বাজারে মুহরত ট্রেডিং একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। দীপাবলির দিন লক্ষ্মীপুজোর শুভক্ষণে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) বিশেষ ট্রেডিং সেশনের আয়োজন করে। সাধারণত এই সেশন প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নতুন অর্থবর্ষের সূচনা হয় দীপাবলির সময় থেকে। এই নতুন বছরকে বলা হয় ‘সম্বৎ’ বা ‘বিক্রম সম্বৎ’। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে দীপাবলিতে নতুন হিসাবের খাতা খোলা, লক্ষ্মীপুজো করা এবং নতুন ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। এই প্রথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই শেয়ার বাজারে মুহরত ট্রেডিংয়ের প্রচলন।
ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের ২০২৪ সালের নভেম্বরের মার্কেট পালস রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৫৭ সাল থেকেই ভারতের আর্থিক জগতে মুহরত ট্রেডিংয়ের ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এই আয়োজন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শুভক্ষণে শেয়ার কেনা মানেই সেই শেয়ারের দাম ভবিষ্যতে বাড়বে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
২০২৬ সালে কখন মুহরত ট্রেডিং?
২০২৬ সালে ৮ নভেম্বর, রবিবার দীপাবলির লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে মুহরত ট্রেডিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। NSE-র প্রকাশিত ২০২৬ সালের ট্রেডিং হলিডে তালিকাতেও এই দিনের উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষ ট্রেডিং সেশনের নির্দিষ্ট সময়সূচি জানতে NSE ও BSE-র সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নিজের ব্রোকারের আপডেট দেখে নেওয়া উচিত।
মুহরত ট্রেডিংয়ে কি সত্যিই লাভ হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অতীতের বাজারের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ।
NSE-র ২০২৪ সালের মার্কেট পালস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০টি মুহরত ট্রেডিং সেশনের মধ্যে ১৫ বারই Nifty 50 ইতিবাচক অবস্থানে বন্ধ হয়েছিল। অর্থাৎ, ২০টি সেশনের মধ্যে মাত্র পাঁচবার সূচক নিম্নমুখী ছিল।
এই পরিসংখ্যান দেখে অনেক বিনিয়োগকারীর মনে হতে পারে, মুহরত ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগ করলে লাভের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি আরও জটিল।
প্রথমত, এক ঘণ্টার ট্রেডিং সেশনে বাজারের ওঠানামা দিয়ে কোনও শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্স বিচার করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট দিনে বাজার ইতিবাচক থাকলেও পরবর্তী দিনগুলিতে সেই প্রবণতা বজায় থাকবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
তৃতীয়ত, বাজারের সামগ্রিক উত্থান এবং কোনও নির্দিষ্ট শেয়ারের লাভজনক হওয়া এক বিষয় নয়।
তাই অতীতের ইতিবাচক পরিসংখ্যানকে ভবিষ্যতের লাভের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মুহরত ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগ করার আগে যে সাতটি বিষয় মাথায় রাখবেন
১. আগে থেকেই বিনিয়োগের পরিকল্পনা করুন
মুহরত ট্রেডিংয়ের সময়সীমা খুবই কম। ফলে বাজার খোলার পর হঠাৎ কোনও শেয়ার দেখে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
কোন সংস্থার শেয়ার কিনবেন, কত টাকা বিনিয়োগ করবেন এবং কতদিন ধরে সেই শেয়ার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।
২. শুধুমাত্র শুভক্ষণ দেখে শেয়ার কিনবেন না
কোনও শেয়ারের দাম কম বা বেশি হওয়া নির্ভর করে সংস্থার আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ, বাজারের পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার উপর।
শুধুমাত্র দীপাবলির শুভক্ষণ বলে কোনও সংস্থার শেয়ার কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সংস্থার আয়, ঋণ, নগদ প্রবাহ, ব্যবসার মডেল এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে তার অবস্থান খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। SEBI-র বিনিয়োগকারী নির্দেশিকাতেও বিনিয়োগের আগে যথাযথ যাচাইয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৩. লিমিট অর্ডার ব্যবহার করুন
মুহরত ট্রেডিংয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কেনাবেচার চাপ বাড়তে পারে। কোনও কোনও শেয়ারে ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যা কম থাকলে দামের দ্রুত পরিবর্তনও হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কেট অর্ডারের পরিবর্তে লিমিট অর্ডার ব্যবহার করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। এতে আপনি সর্বোচ্চ কত দামে শেয়ার কিনতে চান, তা নির্দিষ্ট করে দিতে পারবেন।
৪. অল্প টাকা দিয়ে শুরু করুন
দীপাবলির আবেগে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ছোট অঙ্কের বিনিয়োগই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনের টাকা, বাড়ির খরচের টাকা বা ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট কোনও প্রয়োজনের জন্য রাখা অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করবেন না।
৫. ঋণ নিয়ে বা অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে ট্রেডিং নয়
দীপাবলির শুভক্ষণে বেশি লাভের আশায় অনেকেই ইন্ট্রাডে ট্রেডিং কিংবা ফিউচার ও অপশনসের মতো ডেরিভেটিভস ট্রেডিংয়ে আগ্রহী হন।
কিন্তু এই ধরনের ট্রেডিংয়ে ঝুঁকি অনেক বেশি। বাজারের গতিবিধি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে বড় অঙ্কের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু একটি বিশেষ ট্রেডিং সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য ধার করে বা অতিরিক্ত লিভারেজ নিয়ে বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
৬. পোর্টফোলিওর ভারসাম্য বজায় রাখুন
একটি নির্দিষ্ট সংস্থা বা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের শেয়ারে সমস্ত টাকা বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থা, ক্ষেত্র এবং সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং আর্থিক লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সিকিউরিটিজ মার্কেটস (NISM)-ও বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বৈচিত্র্যকরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
৭. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবুন
মুহরচ ট্রেডিংয়ের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন বিনিয়োগের যাত্রা শুরু করা। এক ঘণ্টার মধ্যে শেয়ার কিনে দ্রুত লাভ করার চেষ্টা নয়।
যে সংস্থার ব্যবসা সম্পর্কে আপনার ধারণা রয়েছে এবং যার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আপনি যথাযথভাবে গবেষণা করেছেন, সেই সংস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারেন।
নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য কী সবচেয়ে ভালো?
যাঁরা প্রথমবার শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে চলেছেন, তাঁদের জন্য মুহরত ট্রেডিং হতে পারে বাজার সম্পর্কে জানার একটি ভালো সুযোগ।
তবে প্রথম দিনেই সরাসরি একাধিক সংস্থার শেয়ার কেনার প্রয়োজন নেই।
প্রথমে ডিম্যাট এবং ট্রেডিং অ্যাকাউন্টের কার্যকারিতা পরীক্ষা করুন। বিনিয়োগের আগে ব্রোকারেজ চার্জ, অন্যান্য লেনদেনের খরচ এবং শেয়ারের ঝুঁকি সম্পর্কে জেনে নিন।
যাঁরা পৃথক শেয়ার বেছে নেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী নন, তাঁরা নিজেদের আর্থিক লক্ষ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী বৈচিত্র্যপূর্ণ মিউচুয়াল ফান্ড বা ইনডেক্স ফান্ডের মতো বিকল্প সম্পর্কে জানতে পারেন। তবে সেখানেও বাজারের ঝুঁকি রয়েছে।
SEBI-র পরামর্শ অনুযায়ী, বিনিয়োগের উদ্দেশ্য, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের সময়সীমা বিবেচনা করেই আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে SEBI-নিবন্ধিত ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজারের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
মুহরত ট্রেডিংয়ের আগে যে ভুলগুলি এড়িয়ে চলবেন
-
সোশ্যাল মিডিয়া বা হোয়াটসঅ্যাপের শেয়ার কেনার টিপস অনুসরণ করবেন না।
-
অন্য কাউকে শেয়ার কিনতে দেখে নিজেও সেই শেয়ার কিনবেন না।
-
দ্রুত লাভের আশায় অতিরিক্ত টাকা বিনিয়োগ করবেন না।
-
কোনও সংস্থার আর্থিক অবস্থা না জেনে শেয়ার কিনবেন না।
-
বাজারের সাময়িক উত্থানকে দীর্ঘমেয়াদি লাভের সংকেত ভাববেন না।
-
নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ করবেন না।
SEBI-র নির্দেশিকাতেও বিনিয়োগের আগে যাচাই, খরচ সম্পর্কে সচেতনতা এবং অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে লেনদেনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শেষ কথা: ঐতিহ্য থাকুক, বিনিয়োগ হোক বিচক্ষণতার সঙ্গে
দীপাবলির মুহরত ট্রেডিং ভারতীয় শেয়ার বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এটি নতুন আর্থিক বছরের সূচনা, নতুন আশা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক।
কিন্তু শেয়ার বাজারে সাফল্য কোনও শুভক্ষণ, বিশেষ দিন কিংবা উৎসবের উপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক গবেষণা, ধৈর্য, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
তাই মুহরত ট্রেডিংয়ে অংশ নিন উৎসবের আনন্দে, নতুন বিনিয়োগের প্রতীকী সূচনা হিসেবে। কিন্তু মনে রাখবেন, মুহরত ট্রেডিং একটি ঐতিহ্য, বিনিয়োগের কৌশল নয়। শুভ সময়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
