Hooghly Tribal Village-এ স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর বিদ্যুতের আলো, দীপাবলিতে অপেক্ষার অবসান

Hooghly Tribal Villageছবি কাল্পনিক (চ্যাট জিপিটি)

দীপাবলি মানেই আলো। চারদিকে প্রদীপ, মোমবাতি, আলোর মালা আর উৎসবের আনন্দ। কিন্তু এমন কিছু মানুষের কাছে আলো মানে শুধু উৎসবের সাজ নয়, আলো মানে বেঁচে থাকার নতুন আশা। আলো মানে সন্তানদের একটু ভালো ভবিষ্যৎ, রাতের অন্ধকারে নিশ্চিন্তে পথ চলা, আর বহু বছরের বঞ্চনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন। হুগলির এক আদিবাসী (Hooghly Tribal Village) গ্রামে এবারের দীপাবলি তাই অন্য রকম। এতদিন যে গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যেত ঘরবাড়ি, সেখানে এবার জ্বলে উঠেছে বিদ্যুতের আলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গ্রামে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। আর সেই বিদ্যুতের আলোয় যেন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের মানুষ।

যে উৎসব এতদিন তাঁদের কাছে ছিল দূর থেকে দেখা আলের উৎসব, আজ তার তাদের হাতের মুঠোয়। এই দীপাবলিতে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলো জ্বলবে এই গ্ৰামে। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর অবশেষে সেই ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। দীপাবলির ঠিক আগে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে তারকেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত আস্তারা দত্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চাকদহে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজেদের বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো দেখতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা গ্রামের বাসিন্দারা।


৭৯ বছরের অন্ধকারের অবসান

চাকদহ গ্রামে প্রায় ৪০০ আদিবাসী পরিবারের বসবাস। যদিও এই পরিসংখ্যান নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকার বাসিন্দারা বিদ্যুৎ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই। কিন্তু খুঁটি থাকলেও তারের সংযোগ ছিল না। ফলে বিদ্যুতের পরিকাঠামো চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও তার সুবিধা পাননি গ্রামের মানুষ। সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে জ্বলত কেরোসিনের আলো, কোথাও ভরসা ছিল হ্যারিকেন কিংবা মোমবাতি।

অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। দীপাবলির আগে গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বাসিন্দারা।

পড়াশোনা থেকে দৈনন্দিন জীবন, সমস্যার শেষ ছিল না

বিদ্যুৎ না থাকার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল গ্রামের শিশু ও পড়ুয়াদের জীবনে। সন্ধ্যার পর পড়াশোনা করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় অনেককেই কেরোসিনের বাতি বা অন্য কোনও অস্থায়ী আলোর ব্যবস্থা করে পড়তে হত।

শুধু পড়াশোনা নয়, বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবনেও ছিল নানা সমস্যা।

  • সন্ধ্যার পর ঘরের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো থাকত না।

  • মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য অন্যের বাড়ি বা বাইরের ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হত।

  • গরমের দিনে পাখা চালানোর সুযোগ ছিল না।

  • রাতের অন্ধকারে বাড়ির বাইরে যাতায়াত ছিল সমস্যার।

  • আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত ছিলেন বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা রুই বাড়ি জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম তাঁদের গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এই পরিষেবা পাওয়ায় তাঁরা অত্যন্ত খুশি।

কীভাবে পৌঁছল বিদ্যুৎ?

স্থানীয় বিধায়ক সন্তু পানের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি গ্রামবাসীদের বিদ্যুৎহীনতার সমস্যার কথা জানতে পারেন। নির্বাচিত হলে এই সমস্যার সমাধান করাই তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বিধায়কের দাবি, প্রায় এক মাস আগে জেলা বিদ্যুৎ দফতরের উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি বিদ্যুতের মিটার বসানোর কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে ৫০টি বাড়িতে নতুন মিটার বক্স বসানো হয়েছে। শতাধিক পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার কাজ চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বিপিএল তালিকাভুক্ত পরিবারগুলিকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

তবে এত বছর ধরে কেন গ্রামটি বিদ্যুৎ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বিধায়ক ও বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণে আগের সরকার এই গ্রামকে প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। যদিও এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়।

গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ছবিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ চাকদহ?

ভারতে গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে চালু হয়েছিল দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা। গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ পরিকাঠামো উন্নত করা, বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কৃষি ও সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি ছিল এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

এর পরে ২০১৭ সালে চালু হয় প্রধানমন্ত্রী সহজ বিজলি হর ঘর যোজনা, যা সৌভাগ্য প্রকল্প নামেও পরিচিত। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিদ্যুৎহীন পরিবারগুলিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া।

কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল দেশের সমস্ত বসতিপূর্ণ বিদ্যুৎহীন জনগণনা গ্রাম বিদ্যুতায়িত হয়েছে বলে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি জানিয়েছিল। ২০১৯ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ইচ্ছুক বিদ্যুৎহীন পরিবারগুলিকে সংযোগ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানানো হয়েছিল।

কিন্তু চাকদহের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। কোনও গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো বা গ্রামকে বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বাড়িতে সংযোগ পৌঁছনো, মিটার বসানো এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

অর্থাৎ, বিদ্যুতের পরিকাঠামো তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। চাকদহের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

এ বার দীপাবলির আনন্দ অন্য রকম

চাকদহের বাসিন্দাদের কাছে এ বছরের দীপাবলি নিছক একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এই উৎসব তাঁদের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এতদিন অন্য গ্রামের বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখলেও নিজেদের বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানোর সুযোগ ছিল না। এ বার সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে।

গ্রামের শিশুদের কাছে এই আলো নতুন করে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করবে। পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ হবে। ভবিষ্যতে বিদ্যুতের সাহায্যে ছোট ব্যবসা, কৃষিকাজ এবং অন্যান্য জীবিকার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু সংযোগ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি পরিবারের বাড়িতে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, সাশ্রয়ী বিল এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আসলে চাকদহের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের আসল মানে শুধু বড় রাস্তা, উঁচু বাড়ি কিংবা আধুনিক শহর নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হল সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষটির ঘরেও মৌলিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া।

দীপাবলিতে যখন চারদিকে প্রদীপ জ্বলবে, তখন হুগলির এই আদিবাসী গ্রামের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হবে নিজেদের বাড়ির বৈদ্যুতিক আলো। ৭৯ বছরের অপেক্ষার পর সেই আলোই যেন তাঁদের জীবনে নতুন আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google