Pizza Hut হস্তান্তর, কতটা বদল আসতে পারে স্বাদ থেকে পরিকাঠামোয়

Pizza hut

১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে বেড়ে ওঠা অনেক ভারতীয়ের কাছে পিজ্জা হাট (Pizza Hut) শুধু এক টুকরো পিজ্জা খাওয়ার জায়গার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। এখানেই জন্মদিনের পার্টি উদযাপন করা হতো, স্কুলের সাফল্যের জন্য পুরস্কার দেওয়া হতো, এবং পারিবারিক বেড়ানো প্রায়শই একটি প্যান পিজ্জা ও সফট ড্রিঙ্কস দিয়ে শেষ হতো। এখন, বিশ্বের অন্যতম পরিচিত এই রেস্তোরাঁ ব্র্যান্ডটি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।

পিজ্জা হাট, কেএফসি এবং টাকো বেলের মূল সংস্থা ইয়াম ব্র্যান্ডস, তীব্র প্রতিযোগিতা, ভোক্তাদের পরিবর্তিত অভ্যাস এবং দুর্বল ব্যয়ের সঙ্গে ব্যবসার টানাপড়েনের মাঝে ২.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি চুক্তিতে এই বিশ্বব্যাপী পিজ্জা চেইনটি বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে পিজ্জা হাট দু’টি ভাগে বিভক্ত হবে। ইয়াম চায়না হোল্ডিংস ১.২ বিলিয়ন ডলারে চিনের মূল ভূখণ্ডের পিজ্জা হাটের ব্যবসা অধিগ্রহণ করবে, অন্যদিকে প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম লংরেঞ্জ ক্যাপিটাল ১.৫ বিলিয়ন ডলারে বাকি বিশ্বব্যাপী ব্যবসাটি কিনে নেবে।


নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে, ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে এই লেনদেনটি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফাস্ট-ফুড শিল্পে ভোক্তাদের পরিবর্তনশীল পছন্দ এবং তীব্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মেলাতে পিজ্জা হাট বেশ কয়েক বছর ধরে লড়াই করে আসছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং পণ্যের উচ্চ মূল্য পিজ্জা চেইনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, এমন এক সময়ে যখন ভোক্তারা খরচের ব্যাপারে আরও সতর্ক হচ্ছেন। একই সঙ্গে,  ওজন কমানোর কারণে ফাস্টফুড থেকে ক্রমশ সরে গিয়েছে মানুষ। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কিছু ভোক্তাকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছে। এছাড়াও, বেশ কয়েকটি বাজারে পিজ্জা হাটকে ডেলিভারি-কেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং স্থানীয় পিজ্জা ব্র্যান্ডগুলোর চাপের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

গত বছর, ইয়াম ব্র্যান্ডস জানিয়েছিল যে বেশ কয়েকটি ত্রৈমাসিকে বিক্রি কমে যাওয়ার পর তারা পিজ্জা হাটের জন্য কৌশলগত বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে। রয়টার্স জানিয়েছে যে, এই বছরের মে মাসে কোম্পানিটি লংরেঞ্জ ক্যাপিটালের সঙ্গে একচেটিয়া আলোচনা শুরু করেছে। ইয়াম ব্র্যান্ডসের সিইও ক্রিস টার্নার বলেছেন, এই বিক্রির ফলে কোম্পানিটি তার অবশিষ্ট ব্যবসাগুলোর ওপর আরও নিবিড়ভাবে মনোযোগ দিতে পারবে।

টার্নার বলেন, ‘‘এই লেনদেনগুলো Yum!-কে আরও বেশি লক্ষ্যকেন্দ্রিক একটি কোম্পানি হতে সক্ষম করবে।’’ বিক্রয়ের পর, Yum Brands-এর কাছে প্রধানত KFC এবং Taco Bell থাকবে, যে দু’টি ব্র্যান্ড সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তিশালী বৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বিশ্বব্যাপী রেস্তোরাঁ শিল্পে পিৎজা হাট অন্যতম পরিচিত একটি নাম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে পেপসিকো এই চেইনটি অধিগ্রহণ করে এবং পরে ১৯৯৭ সালে KFC ও Taco Bell-এর সঙ্গে এটিকে আলাদা করে ট্রাইকন গ্লোবাল রেস্তোরাঁস গঠন করা হয়, যা অবশেষে ২০০২ সালে Yum Brands-এ পরিণত হয়।

কয়েক দশক ধরে, পিৎজা হাট বিশ্বজুড়ে প্রসারিত হয়েছে এবং সংগঠিত পিৎজা ডাইনিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে উঠেছে। ভারতে, এই ব্র্যান্ডটি অনেক ভোক্তাকে পশ্চিমী ধাঁচের ক্যাজুয়াল ডাইনিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল, এমন এক সময়ে যখন আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ চেইনগুলো সবেমাত্র দেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল।

তবে, গত দশকে পিৎজার ব্যবসায় নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে, কারণ অনলাইন অর্ডারিং, ফুড ডেলিভারি অ্যাপ এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এই শিল্পকে রূপান্তরিত করেছে। এই লেনদেনের অন্যতম বড় একটি অংশ চিনকে ঘিরে, যা পিজা হাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। ইয়াম চায়না ১.২ বিলিয়ন ডলারে চিনের মূল ভূখণ্ডের পিজা হাট ব্যবসা অধিগ্রহণ করবে।

এই পদক্ষেপটি একটি বৃহত্তর লক্ষ্যকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো স্থানীয় ভোক্তাদের পছন্দ এবং প্রতিযোগিতামূলক চাপের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সাড়া দেওয়ার জন্য স্থানীয় অপারেটরদের হাতে ক্রমবর্ধমানভাবে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছে।

এই মাসের শুরুতে, জেনারেল মিলস চিনের মূল ভূখণ্ডে তাদের হাগেন-ডাজ দোকানগুলো চা চেইন নিংজির নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। রয়টার্স আরও জানিয়েছে যে, স্টারবাকসও গত বছর তাদের চিন ব্যবসার একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বয়ু ক্যাপিটালের কাছে বিক্রি করেছে।

ইয়াম চায়না, যা ইয়াম ব্র্যান্ডস থেকে আলাদা হয়ে গঠিত হয়েছে এবং যার সদর দফতর সাংহাইতে অবস্থিত, বর্তমানে ১৮,০০০-এরও বেশি রেস্তোরাঁর মালিক এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনা করে। কোম্পানিটি ২০২৮ সালের মধ্যে চিনে পিজা হাটের উপস্থিতি ৬,০০০-এরও বেশি আউটলেটে প্রসারিত করার পরিকল্পনা করছে।

লংরেঞ্জ ক্যাপিটালের জন্য, এই অধিগ্রহণটি বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃত একটি রেস্তোরাঁ ব্র্যান্ডকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুযোগ। ই-টোরোর বাজার বিশ্লেষক স্যাম নর্থ বলেছেন, এই চুক্তিটি পিজ্জা হাটকে নতুন মালিকানার অধীনে নিজেদের নতুন করে ঢেলে সাজানোর সুযোগ করে দেবে। নর্থ রয়টার্সকে বলেন, ‘‘লংরেঞ্জ ক্যাপিটাল কার্যকরভাবে এমন একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ব্র্যান্ড কিনছে যার আরও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রয়োজন, অন্যদিকে ইয়াম চায়নার এই পদক্ষেপ স্থানীয় পরিচালকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেবে।’’

তিনি আরও যোগ করেন যে, যদিও এত সুপরিচিত একটি ব্র্যান্ডের জন্য এই মূল্যায়ন খুব বেশি মনে নাও হতে পারে, তবে এই লেনদেনটি এমন একটি ব্যবসাকে সরিয়ে দেয় যা ইয়াম ব্র্যান্ডসের জন্য একটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘‘এত বিখ্যাত একটি নামের জন্য দামটি আকর্ষণীয় নয়, কিন্তু এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বোঝা দূর করে এবং পিজ্জা হাটকে একটি নতুন সুযোগ দেয়। এটি ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে,’’ নর্থ বলেন।

এই বিক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ‘ইয়াম ব্র্যান্ডস’-এর অংশ হিসেবে পিৎজা হাটের প্রায় তিন দশকের যাত্রার সমাপ্তি ঘটছে। পাশাপাশি, মূল ভূখণ্ড চিনে ‘টাকো বেল’-এর (Taco Bell) কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ‘ইয়াম ব্র্যান্ডস’ এবং ‘ইয়াম চায়না’ (Yum China) যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া, ‘কেএফসি চায়না’-র (KFC China) ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেন নিয়েও কোম্পানি দু’টি সমঝোতায় পৌঁছেছে।

বিনিয়োগকারীরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ৪ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত শেয়ার পুনঃক্রয় বা ‘বাইব্যাক’ কর্মসূচির ঘোষণার পর ‘ইয়াম ব্র্যান্ডস’-এর শেয়ারের দর প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, শুরুর দিকের দরপতন কাটিয়ে ওঠার পর ‘ইয়াম চায়না’-র শেয়ারের দামে বড় কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি।

ভোক্তাদের জন্য সুখবর হল, পিৎজা হাটের রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। বরং ব্র্যান্ডটি এখন নতুন মালিকদের অধীনে পরিচালিত হবে; তারা এমন একটি ব্যবসার প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের আশা করছেন, যা একসময় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ গ্রাহকের কাছে পিৎজা খাওয়ার অভিজ্ঞতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা সময়ই বলে দেবে, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত: ফাস্ট-ফুড শিল্পের অন্যতম বিখ্যাত একটি নাম নতুন এক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle