দূর্গাপূজার (Durga Puja) চার দিন যেন বাঙালির কাছে শুধুই উৎসব নয়, রসনারও এক মহোৎসব। ষষ্ঠীর শুরু থেকে নবমীর রাত পর্যন্ত প্যান্ডেল হপিং, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া চলে সমান তালে। কিন্তু দশমীর দিনটা একটু আলাদা। সিঁদুরখেলা, মাকে বিদায় জানানোর আবেগ, বিজয়ার প্রণাম আর প্রিয়জনের সঙ্গে মিষ্টিমুখ—সব মিলিয়ে দশমীর আবহে থাকে আনন্দের পাশাপাশি একরাশ নস্টালজিয়া।
আর সেই আবেগের সঙ্গে যদি জুড়ে যায় একেবারে বাঙালির ঘরের রান্না, তাহলে বিজয়ার আনন্দ আরও জমে ওঠে। দশমীর দুপুরের পাত তাই হতে পারে একেবারে বাঙালি কায়দায় সাজানো। ভাত, ডাল, মাছ, মাংস থেকে মিষ্টি—কোন কোন পদ জায়গা করে নিতে পারে সেই বিশেষ পাতের কেন্দ্রে?
১. ভাত আর ঘি—শুরুটা হোক চিরপরিচিত স্বাদে
বাঙালির দুপুরের খাবারে ভাতের কোনও বিকল্প নেই। দশমীর বিশেষ ভোজও তার ব্যতিক্রম নয়। গরম সাদা ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি—এই সাধারণ জুটিই অনেকের কাছে উৎসবের খাবারের সেরা শুরু।
তার সঙ্গে যদি থাকে ডাল আর ভাজা, তাহলে জমে যায় প্রথম পর্ব।
২. ডাল আর বেগুন ভাজা—সাদামাটায় মন জয়
মুসুর ডাল, সোনালি করে ভাজা বেগুন কিংবা আলু ভাজা—এই পদগুলির মধ্যে কোনও বাহুল্য নেই। অথচ বাঙালির রসনায় এদের জায়গা চিরস্থায়ী।
দশমীর দুপুরে পুজোর ব্যস্ততার পর বাড়ির রান্নাঘর থেকে উঠে আসা ডাল-ভাজার গন্ধই অনেকের কাছে উৎসবের আসল অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
৩. শুক্তো—বাঙালিয়ানার অনন্য পরিচয়, স্বাস্থ্যকরও
একটি বাঙালি ভোজ শুক্তো ছাড়া সম্পূর্ণ হয় কি? করলা, কাঁচকলা, আলু, বেগুন-সহ বিভিন্ন সবজির মিশেলে তৈরি শুক্তোর স্বাদ একেবারেই আলাদা।
দশমীর পাতের শুরুতে শুক্তো থাকলে খাবারে আসে সেই চেনা বাঙালি ঐতিহ্যের ছোঁয়া। তেতো স্বাদের পরেই যেন শুরু হয় আসল ভোজ।
৪. আলু-পটলের দম—নিরামিষ পদেই উৎসবের স্বাদ
মাছ-মাংসের বাইরে বাঙালির রান্নাঘরে এমন কিছু পদ রয়েছে, যেগুলি একাই ভাতের সঙ্গে জমিয়ে দেওয়া যায়। আলু-পটলের দম তার মধ্যে অন্যতম।
মশলার সুন্দর গন্ধ, নরম আলু আর পটল—দশমীর দুপুরে এই পদটি হতে পারে নিরামিষ পাতে অন্যতম আকর্ষণ।
৫. লুচি আর ছোলার ডাল—দশমীর অন্যরকম আনন্দ
দশমীর দুপুরে কেউ যদি ভাতের বদলে লুচি দিয়ে শুরু করতে চান, সঙ্গে থাকতে পারে ছোলার ডাল। নারকেল কুচি, আদা আর হালকা মশলার গন্ধে তৈরি ছোলার ডাল বাঙালির প্রিয় খাবারের তালিকায় বহুদিনের।
আর গরম গরম ফুলকো লুচি? তার আবেদন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই।
৬. সর্ষে ইলিশ—উৎসবের পাতের রাজা
ইলিশ বাঙালির আবেগ। আর সর্ষে ইলিশ সেই আবেগকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়।
সর্ষের ঝাঁঝ, কাঁচালঙ্কার গন্ধ আর নরম ইলিশের টুকরো—দশমীর বিশেষ দুপুরে এই পদ থাকলে ভাতের সঙ্গে তার জমাটি জুটি তৈরি হতে বাধ্য।
তবে পুজোর সময়ে ইলিশের দাম ও বাজারের জোগান অনেকের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইলিশ না থাকলেও মন খারাপের কারণ নেই।
৭. কষা মাংস—দশমীর ভোজের জমজমাট পদ সঙ্গে পোলাও
বাঙালির উৎসবের রান্নায় কষা মাংসের আলাদা জায়গা রয়েছে। মাটন কষা হলে তো কথাই নেই। সঙ্গে যদি হয় বাসন্তি পোলাও তাহলে একবার কম্বিনেশনটা ভাবুন।
গাঢ় মশলার ঝোল, নরম মাংস আর সঙ্গে গরম ভাত কিংবা লুচি বা পোলাও—দশমীর দুপুরের জন্য এর থেকে লোভনীয় সংমিশ্রণ আর কী হতে পারে!
৮. চিংড়ি মালাইকারি—বাঙালির ভোজে অভিজাত ছোঁয়া
যাঁরা একটু অন্যরকম পদ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য চিংড়ি মালাইকারি হতে পারে দারুণ বিকল্প।
নারকেলের দুধের মোলায়েম স্বাদ, চিংড়ির নিজস্ব গন্ধ এবং মশলার ভারসাম্য—এক প্লেট সাদা ভাতের সঙ্গে এই পদ মুহূর্তেই দশমীর দুপুরকে বিশেষ করে তুলতে পারে।
৯. মোচার ঘণ্ট বা ধোকার ডালনা—নিরামিষে ঐতিহ্য
দশমীর ভোজ মানেই যে শুধু মাছ-মাংস, তা নয়। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ রান্নারও রয়েছে দীর্ঘ তালিকা।
মোচার ঘণ্ট, ধোকার ডালনা কিংবা লাউ-চিংড়ির মতো পদ ঘরোয়া রান্নার স্বাদকে ফিরিয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিরামিষ খাবার পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এগুলি হতে পারে সেরা পছন্দ।
১০. চাটনি—শেষ পাতে মিষ্টি-টক চমক
বাঙালি ভোজে চাটনি না থাকলে যেন কোথাও একটা ফাঁক থেকে যায়।
কাঁচা আম, টমেটো, খেজুর কিংবা আনারসের চাটনি।জলপাই বা পেটেও চলতে পারে—যে কোনও একটি পদেই দুপুরের খাবারের শেষ পর্ব জমিয়ে দেওয়া যায়।
১১. পায়েস—বিজয়ার মিষ্টি স্মৃতি
দশমীর দিন মিষ্টিমুখ হবেই। কিন্তু বাড়িতে তৈরি পায়েসের মতো আবেগের খাবার খুব কমই আছে।
গোবিন্দভোগ চাল, দুধ, চিনি, এলাচ আর কিশমিশ-কাজুবাদাম দিয়ে তৈরি পায়েস শুধু একটি মিষ্টি নয়, বাঙালির পারিবারিক উৎসবের স্মৃতির অংশ।
১২. সন্দেশ, রসগোল্লা আর মিষ্টি দই
বিজয়া দশমীর কথা উঠবে আর মিষ্টির কথা হবে না—তা কি হয়?
সন্দেশ, রসগোল্লা, মিষ্টি দই কিংবা ছানার তৈরি নানা মিষ্টি দিয়ে হতে পারে শেষ পাতে মিষ্টিমুখ। প্রিয়জনের বাড়িতে বিজয়ার প্রণামের পর হাতে তুলে দেওয়া মিষ্টির বাক্সও তো বাঙালির ঐতিহ্যেরই অংশ।
তাহলে দশমীর ‘সেরা ডিশ’ কোনটি?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য একেক বাঙালির কাছে একেক রকম।
কারও কাছে সর্ষে ইলিশই সেরা, কারও কাছে কষা মাংস। কেউ আবার গরম ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা আর চাটনির মধ্যেই খুঁজে পান পুজোর আসল আনন্দ। আবার অনেকের কাছে লুচি-ছোলার ডাল কিংবা চিংড়ি মালাইকারিই হতে পারে দশমীর বিশেষ আকর্ষণ।
আসলে দশমীর সেরা খাবার কোনও একটি পদ নয়।যে খাবারের সঙ্গে মিশে থাকে বাড়ির মানুষের হাতের স্বাদ, ছোটবেলার স্মৃতি আর প্রিয়জনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ—সেটিই বাঙালির কাছে বিজয়া দশমীর সেরা ডিশ।
মায়ের বিদায়ের দিনে তাই পাতে থাকুক বাঙালিয়ানার স্বাদ, আর মনের মধ্যে থাকুক আগামী বছরের অপেক্ষা—আসছে বছর আবার হবে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
