প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে কোথাও উষ্ণ জলের এক বিশাল স্রোত বা ঢেউ এগিয়ে চলেছে। ইন্দোনেশিয়ার কাছে শুরু হওয়া এই স্রোতটি বিষুবরেখা বরাবর মাসের পর মাস ধরে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে; এটি তাপের এক ধীর ও অদৃশ্য প্রবাহ, যা কোনও কোনও বিজ্ঞানীর মতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে প্রায় ১৪,৫০০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। যা এল নিনোর (El Nino) জন্ম দেবে।
কোনও জাহাজ এর অস্তিত্ব টের পায়নি, কোনও নাবিকও এটি দেখতে পাননি। অথচ ১,৩০০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণরত নাসার একটি উপগ্রহ ঠিকই একে শনাক্ত করতে পেরেছিল; কারণ উষ্ণ জলরাশি যখন বয়ে যাচ্ছিল, তখন তার ওপরের সমুদ্রপৃষ্ঠ নিঃশব্দে প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার উপরে উঠে এসেছিল। সমুদ্রের সেই মৃদু স্ফীতি—যার গতিবিধি ২০২৬ সালের বসন্তকাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল—ছিল আসলে অনেক আগে থেকেই দেওয়া এক সতর্কবার্তা। ১১ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (NOAA) ঘোষণা করে যে ‘এল নিনো’ (El Niño) সৃষ্টি হয়েছে; আবহাওয়াবিদদের ধারণা, এটি ভবিষ্যতে একটি বিরল ও শক্তিশালী ঘটনায় রূপ নিতে পারে।
এল নিনো হল একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের উষ্ণ পর্যায়, যার ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বিন্যাসে পরিবর্তন আসে। শত শত বছর আগে জেলেরা এই নামকরণ করেছিলেন। স্প্যানিশ ভাষায় এর অর্থ ‘বালক’ বা ‘শিশু’ (যিশু খ্রিস্টের শিশু রূপের প্রতি ইঙ্গিত করে), কারণ সমুদ্রের জলরাশি উষ্ণ হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত বড়দিনের (ক্রিসমাস) সময় সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাত।
কেলভিন ওয়েভ কী এবং এটি কীভাবে এল নিনোর সূত্রপাত ঘটায়?
সাধারণত, প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বাণিজ্য বায়ু (trade winds) পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার কাছে উষ্ণ জলরাশি জমা হতে থাকে এবং একই সময়ে পেরুর উপকূলে গভীর সমুদ্রের শীতল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জলরাশি ওপরের দিকে উঠে আসে। গভীর সমুদ্রের এই শীতল জলরাশি ওপরে উঠে আসার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘আপওয়েলিং’ (upwelling)।
মাঝে মাঝে এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষণিকের জন্য বিপরীতমুখী হয়ে যায়। তখন পশ্চিমে জমে থাকা উষ্ণ জলরাশির বিশাল স্তূপটি আবার পূর্ব দিকে সরে আসতে শুরু করে। জলের নিচে সৃষ্ট এই ধীরগতির বিশাল ঢেউ—যা শত শত কিলোমিটার চওড়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত—তা-ই হল ‘কেলভিন ওয়েভ’।
উষ্ণ জল আয়তনে প্রসারিত হয় এবং বেশি জায়গা দখল করে, ফলে এর ওপরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যায়। এই ঢেউটি ‘থার্মোক্লাইন’-কেও (উষ্ণ উপরিভাগের জল ও গভীরের শীতল জলের মধ্যবর্তী স্তর) নিচের দিকে ঠেলে দেয়; এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার কাছে শীতল জল ওপরে ওঠার প্রক্রিয়া বা আপওয়েলিং বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এল নিনোর সৃষ্টি হয়।
নাসার সেন্টিনেল-৬ উপগ্রহ কীভাবে এটি শনাক্ত করল?
নাসা এবং তাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের দ্বারা ২০২০ সালে উৎক্ষেপিত ‘সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেলিচ’ উপগ্রহটি প্রতি ১০ দিন অন্তর পুরো মহাসাগরের উচ্চতার মানচিত্র তৈরি করে এবং তা ইঞ্চির ভগ্নাংশ পর্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারে।
জানুয়ারির শেষের দিকে এটি মাইক্রোনেশিয়ার কাছে একটি ছোট কেলভিন ওয়েভ শনাক্ত করেছিল, যা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে মিলিয়ে যায়। এরপর মার্চের শুরুর দিকে আরও অনেক বড় একটি ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় এবং তা পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ পেরু সংলগ্ন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দীর্ঘমেয়াদী গড় মানের চেয়ে ১৫ সেন্টিমিটারেরও বেশি বেড়ে যায়।
২০২৬ সালে কি একটি ‘সুপার এল নিনো’ দেখা দেবে?
সম্ভবত। এনওএএ (NOAA)-এর আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা গড় মানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যাওয়ার ৬৩ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই মাত্রাটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর লক্ষণ—যেমনটি ১৯৯৭ এবং ২০১৫ সালে দেখা গিয়েছিল।
ভারতের জন্য এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গিছে যে, শক্তিশালী এল নিনো দক্ষিণ-পশ্চিম মরসুমী বায়ুকে দুর্বল করে দেয়; যদিও ‘ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল’-এর মতো বিষয়গুলো এই প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই শীতকালেই ঘটনাটি তার তীব্রতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। মহাসাগর তার বার্তা দিয়েছে। এখন বিশ্ব অপেক্ষা করছে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
