ট্রফি জয়ের ২৪ ঘণ্টা পরেও East Bengal তাঁবুতে আবেগের বিস্ফোরণ

সুচরিতা সেন চৌধুরী: কেটে গিয়েছে ২৪ ঘণ্টা। রাতের পর ভোর হয়েছে, দুপুর গড়িয়ে বিকেলও নেমেছে ময়দানে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল (East Bengal) সমর্থকদের আবেগের বিস্ফোরণ অব্যহত। বৃহস্পতিবার কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে ঠিক যেখানে শেষ করেছিলাম, শুক্রবার ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে যেন সেখান থেকেই শুরু হল। সমর্থকদের উচ্ছ্বাস বলে দিচ্ছিল গত ২৪ ঘণ্টায় দু’চোখের পাতা এক করেননি তাঁরা। শহরের বিভিন্ন রাস্তা পেরিয়ে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের দিকে যেতে যেতে পথে বার বার দেখা হল লাল-হলুদ সমর্থকদের সঙ্গে। কখনও উল্টোডাঙার মোরে, তো কখনও বেলেঘাটায়। কখনও আমাহার্স্ট্রিটের গলিতে তো কখনও ধর্মতলার মোরে। ভিরটা জমাট বাঁধতে শুরু করেছে ইডেন গার্ডেনের উল্টোদিক থেকে লেসলি ক্লডিয়াস সরণির শুরুতেই। সেটা টপকে ক্লাবের গেট পর্যন্ত যাওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ তখন। আর ক্লাবের গেটে পৌঁছে, সেখান থেকে মাঠের মিডিয়া জোনে পৌঁছতে রীতিমতো বেগ পেতে হল। না, রাগ হচ্ছিল না। আসলে এটাই তো আবেগ, এটাই ২২ বছরের দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসানের উৎসব। এমনটা না হলে আর ভক্ত কী? এক কট্টর মোহনবাগান ফ্যান এই উচ্ছ্বাস দেখতে দেখতে বলছিলেন, ‘‘এমন আবেগ মনে হয় ইস্টবেঙ্গলেরই আছে, অন্য কারও দেখিনি।’’

এবারের আইএসএল ১৩ ম্যাচের। নানান টাল-বাহানার পর শেষ পর্যন্ত আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে প্রথম থেকেই ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিল ইস্টবেঙ্গল, এবার ব্যতিক্রম হবে। তবে মাঝের কিছুটা টালমাটাল পরিস্থিতি কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানো। তার মধ্যেই কোচ অস্কার ব্রুজোঁর একগুচ্ছ বিস্ফোরক মন্তব্য। সব মিলে এবারের ইস্টবেঙ্গল রীতিমতো ঘটনাবহূল। আর তার মধ্যে অন্যতম অবশ্যই ২২ বছর পর জাতীয় পর্যায়ের লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ২০০৪ সালে সুভাষ ভৌমিকের হাত ধরে জাতীয় লিগে সাফল্য এসেছিল ইস্টবেঙ্গলের। তার পর জাতীয় লিগ বদলে আই লিগ হল। সেখানে কোনও ট্রফি নেই তাদের। আইএসএল-এ দেরিতে যোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রফির খাতায় নাম লেখাল লাল-হলুদ ব্রিগেড। কৃতিত্ব অবশ্যই দিতে হবে কোচ অস্কার ব্রুজোঁ, টেকনিক্যাল হেড থাংবোই সিংতো ও টিম ম্যানেজমেন্টকে, যারা এই দলটা তৈরি করেছিলেন।


ডার্বি জিতলেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারত ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু তেমনটা হল না। ডার্বি ড্র হয়ে গেল। যার ফল শেষ ম্যাচ ফাইনালের রূপ নিল। তবে শুধু ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান নয়। এবার শেষ ম্যাচে চ্যাম্পিয়নশিপের দাবিদার ছিল পাঁচ দল। ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের মধ্যে যে দলই জিতত সেই দলই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। দুই দল ড্র করলে বা দুই দলই জিতলে গোল পার্থক্যে চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গলই ছিল। কলকাতার দুই দলের এই ইকুয়েশন ভেস্তে যেতে পারত যদি তারা হেরে বসত বা ড্র করত এবং পঞ্জাব বনাম মুম্বই ম্যাচে যে দল জিতে যেত সেই দলই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত। অন্যদিকে সুযোগ ছিল জামশেদপুরেরও। এই পরিস্থিতিতে কলকাতার দুই দলের হার এবং পঞ্জাব-মুম্বই ম্যাচ যদি ড্র হত তাহলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারত জামশেদপুরও। তবে এই মরসুমটা যে ইস্টবেঙ্গলের নামেই লিখে দিয়েছিল ফুটবলের ভগবান।

এবার ফিরে আসি বর্তমানে। শুক্রবারের বিকেল। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বাইরে, ভিতরে জনসমুদ্র। প্রিয় দলের ট্রফি সেলিব্রেশন দেখার জন্য ক্লাবের তরফে এদিন সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল গ্যালারি। একটা সময় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছিল। কলকাতা পুলিশ আর প্রাইভেট সিকিউরিটির তৎপড়তায় সেই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তাঁর মধ্যেই প্রায় দু’ঘণ্টা দেড়িতে শুরু হল অনুষ্ঠান। না, তাতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে, স্লোগানে, গানে কোনও ঘাটতি পড়েনি। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় প্রথম মাঠে ঢুকল ট্রফি। তার পরই একে একে অতিথিরা। শেষে পুরো দল, কোচেদের আগমন হতেই যেন সব আবেগের বাধ ভেঙে গেল ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে। যেন ডার্বি খেলতে নামছে প্রিয় দল। আসলে সব জয়ের সেরা, এই আবেগ। যার জন্য এত লড়াই। একে একে সবাই গলায় পরে নিলেন পদক। আরও একবার হাতে উঠল ট্রফি। যেটা কিশোর ভারতীতে সম্ভব হয়নি সেটা এখানে হল। চ্যাম্পিয়ন্স বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিল পুরো দল।

তার পরও বাকি ছিল অনেকটা। শুধু কি সমর্থকদেরই আবেগ, উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ার অধিকার তো এই সাফল্যের কারিগরদেরও আছে। যার নেতৃত্ব দিলেন, প্রভসুখন সিং গিল। তাঁর আর আনোয়ার আলির সঙ্গে ভাংড়ায় মাতল পুরো দল। এক পায়ে নেচে মাতিয়ে দিলেন সল ক্রেসপো। আগের দিন যখন মাঠ থেকে বেরচ্ছিলেন ক্রাচে ভর দিয়ে, তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘কেমন আছে চোট?’’ ক্রাচ মাথার উপর তুলে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘আমি একদম ফিট হয়ে গিয়েছি।’’ এটাই আবেগ। ক্রাচে ভর দিয়ে বেরলেন মহেশও। যদিও ক্লাবের অনুষ্ঠানে এদিন তিনি উপস্থিত ছিলেন না। একই অবস্থা রাকিপেরও। তবে দল জিতে যাওয়ায়, সব চোট ভুলে গিয়েছেন ফুটবলাররা। এদিন যেভাবে নেচে মাত করলেন মাঠ, তাতে এটা স্পষ্ট এই উৎসব চলবে আরও কয়েকদিন। ট্রফি জ্বল জ্বল করবে ক্লাবের ক্যাবিনেটে, যা ফাইনালের রাতেই পৌঁছে গিয়েছিল ক্লাবে।

এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান শেষে মাঠ ছেড়ে যখন ঢেউয়ের মতো বেরচ্ছে হাজার হাজার সমর্থক তখন আরও একবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে বেরিয়ে আইএসএল জয়ের উৎসব ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে শহরতলিতে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। একরাশ স্বপ্ন নিয়ে আবারও মাঠ ভরাবেন ওরা। ওদের এই আবেগ দীর্ঘজীবী হোক। ইস্টবেঙ্গল কর্তা বাবু চক্রবর্তী সামনে থেকে এদিন সব ব্যবস্থা দেখছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে ধরা হলে আবেগে গলা আটকে আসছিল, বলছিলেন, ‘‘এই প্রজন্ম কোনও সাফল্য না দেখেই ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক হয়েছে। ওরা তো ২০০৪ দেখে‌নি। ২২টা বছর, দুটো যুগ। ওদের জন্য, সব সমর্থকদের জন্য এই জয় দরকার ছিল আমাদের। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি।’’ এদিন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের উৎসবে গা ভাসাতে দেখা গেল দীপ্সিতা ধরকেও। এতদিন রাজনীতির ময়দানে দাঁপিয়ে চলা মেয়েটা যে এতটা ফুটবল পাগল তা এদিন না দেখলে বোঝা যেত না। রীতিমতো গানের তালে পা মেলালেন। কখনও দেখা গেল বসে বসেই নাচছেন লাল-হলুদ আবীর মেখে। এটাই তো আবেগ, এটাই প্রিয় দলের জন্য উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া।

আর এর মধ্যেই আরও একটা দাবি উঠে গেল, থাকতে হবে অস্কারকে। তিনিই তো মসিহা এই দলের। সে যে যাই বলুন না কেন, শেষ কথা বলে সাফল্য। শেষ কথা বলবে ইস্টবেঙ্গল ক্যাবিনেটে রাখা আইএসএল ২০২৫-২৬-এর ট্রফি। এদিনও অস্কারকে দেখা গেল সমর্থকদের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়ে দিতে। গলায় ঝোলানো পদক নিয়ে এগিয়ে গেলেন ফেন্সিংয়ের দিকে। পদকটা তুলে দেখালেন সমর্থকদের। তখন কী তাঁর চোখটা ছলছল করছিল? দূর থেকে বোঝা মুশকিল তবে জয়ের রাতে কিশোর ভারতীর গ্যালারিতে উঠে যখন ‘জয় ইস্টবেঙ্গল’ ধ্বনিতে সমর্থকদের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলেন, তখন চিক চিক করছিল অস্কারের চোখের কোণা। আইএসএল জয়র উৎসব কেটে গেলে অস্কারকে ধরে রাখার লক্ষ্যে নিশ্চিতভাবে ঝাঁপাবে স্পনসর সংস্থা ইমামি। ক্লাবও নিশ্চই সেটাই চাইবে। আর চাইবে এই চ্যাম্পিয়ন দলকে ধরে রাখতে। বাকিটা ফেডারেশনের হাতে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle