Louvre Museum ডাকাতির এক বছর পরও নিখোঁজ ফরাসি রাজমুকুটের ১০ কোটি ডলারের গয়না

বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর ল্যুভরে (Louvre Museum)-তে দিনের আলোয় ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর গয়না চুরির এক বছর পূর্ণ হল। কিন্তু এক বছর পরেও উদ্ধার হয়নি ফরাসি রাজপরিবারের ঐতিহাসিক অলঙ্কারগুলির বড় অংশ। আনুমানিক ১০ কোটি ডলার (প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ইউরো) মূল্যের আটটি অমূল্য গয়না এখনও নিখোঁজ। চার প্রধান সন্দেহভাজন জেলে বন্দি থাকলেও গয়নাগুলির কোনও সন্ধান মেলেনি।

মাত্র সাত মিনিটে ল্যুভরে হানা

ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর সকালে। দর্শকদের জন্য খোলার মাত্র কিছুক্ষণ পর। কর্মীর ছদ্মবেশে আসা চার দুষ্কৃতী একটি যান্ত্রিক মই ব্যবহার করে ল্যুভরের বিখ্যাত Galerie d’Apollon-এর উঁচু জানলার কাছে পৌঁছে যায়।


এরপর শিল্পকর্ম ও রাজকীয় অলঙ্কার রাখা কাচের প্রদর্শনী ভেঙে তারা একের পর এক মূল্যবান গয়না তুলে নেয়। গোটা অভিযান শেষ করতে সময় লাগে মাত্র সাত মিনিটের মতো। পালানোর সময় তারা মোটরবাইকে চেপে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

ঘটনাটি শুধু ফ্রান্স নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ মহলে আলোড়ন তৈরি করে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এই ঘটনাকে ফ্রান্সের ইতিহাসের উপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ঠিক কী কী চুরি হয়েছিল?

চুরি যাওয়া অলঙ্কারগুলির সঙ্গে ফরাসি রাজপরিবার ও নেপোলিয়ন যুগের সরাসরি ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে।

নিখোঁজ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • রানী Marie-Amélie ও Queen Hortense-এর স্যাফায়ার সেটের মুকুট ও নেকলেস
  • ওই সেটের একটি স্যাফায়ার কানের দুল
  • Marie-Louise-এর সংগ্রহের পান্নার নেকলেস ও কানের দুল
  • একটি ঐতিহাসিক রিলিকোয়ারি ব্রোচ
  • সম্রাজ্ঞী Eugénie-র মূল্যবান টায়রা
  • সম্রাজ্ঞী ইউজেনির বড় বডিস-বো ব্রোচ

চুরি যাওয়া অলঙ্কারগুলিতে হাজার হাজার হিরে ও অন্যান্য মূল্যবান রত্ন ছিল।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অলঙ্কার উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুটটি পালানোর সময় চোরেরা ফেলে যায় বলে তদন্তকারীদের ধারণা। সেটি পরে জাদুঘরের বাইরে উদ্ধার করা হয়।

এক বছর ধরে তল্লাশি, তবু নেই গয়নার হদিশ

ঘটনার পর ফরাসি তদন্তকারীরা ব্যাপক অভিযান শুরু করেন। সন্দেহভাজনদের বাড়ি, আত্মীয়দের বাড়ি, গ্যারেজ, সেলার ও অ্যাটিক—বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়েছে।

তদন্তে প্রায় ১০০ জনের একটি দল কাজ করেছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু এত বড় তদন্তের পরেও এখনও উদ্ধার হয়নি চুরি যাওয়া আটটি গয়না।

তদন্তকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হল উত্তর প্যারিসের Aubervilliers এলাকার একটি ভূগর্ভস্থ পার্কিংয়ের CCTV ফুটেজ। সেটিই এখনও পর্যন্ত গয়নাগুলির শেষ নিশ্চিত অবস্থানের সূত্র বলে মনে করা হচ্ছে। চার প্রধান সন্দেহভাজনই ওই এলাকার সঙ্গে যুক্ত।

Louvre Museum

গয়না কি প্যারিসেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে?

তদন্তকারীদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শিল্প-চুরি বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, চুরি করা গয়না হয়তো এখনও প্যারিস অঞ্চলের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

কারণ এত ঐতিহাসিক পরিচিতি থাকা গয়না সাধারণ বাজারে বিক্রি করা অত্যন্ত কঠিন। গয়না কোথাও দেওয়ালের মধ্যে লুকিয়ে রাখা, মাটির নিচে পুঁতে রাখা অথবা কোনও বিশ্বস্ত সহযোগীর কাছে রেখে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

তদন্তকারীদের জন্য বড় প্রশ্ন হল—চোরেরা কি নিজেরাই গয়নাগুলি লুকিয়ে রেখেছিল, নাকি কোনও ‘ফেন্স’ বা মধ্যস্থতাকারীর হাতে তুলে দিয়েছিল?

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—গয়নাগুলি ভেঙে ফেলা হয়েছে?

তদন্তকারীদের কাছে আরও ভয়ঙ্কর একটি সম্ভাবনা রয়েছে। চুরি করা অলঙ্কারগুলি যদি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের হাতে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে সেগুলি ভেঙে আলাদা হিরে ও রত্ন হিসেবে বিক্রি করার চেষ্টা হতে পারে।

এমনটা হলে আসল অলঙ্কারগুলিকে আগের অবস্থায় উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

ইন্টারপোলের চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে আটটি নিখোঁজ অলঙ্কারের ছবি ও বিবরণ ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সেগুলি বিক্রির চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তদন্তে আন্তর্জাতিক যোগ

ল্যুভর চুরির তদন্ত শুধু ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের মূল্যবান রত্নের বাজারগুলিও নজরে এসেছে। বিশেষ করে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প নিয়ে তদন্তকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

ল্যুভর থেকে চুরি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেলজিয়াম পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছিল, যাতে কেউ চুরি যাওয়া গয়না বিক্রি করতে বা বাজারে চালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটকানো যায়।

২০২৬ সালের জুনে সন্দেহজনক ফোন রেকর্ডের সূত্র ধরে তদন্তকারীদের নজর আরও একবার বেলজিয়ামের দিকে যায়।

চার সন্দেহভাজন জেলে, কিন্তু মূল রহস্য অমীমাংসিত

চুরির পর প্রথম দশ দিনের মধ্যেই চার প্রধান সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত এগোলেও চুরি যাওয়া গয়না এখনও পুলিশের হাতে আসেনি।

তদন্তকারীরা এখনও খতিয়ে দেখছেন, এই চারজনই কি গোটা অপারেশনের পরিকল্পনাকারী, নাকি তাঁদের পিছনে আরও বড় কোনও চক্র রয়েছে।

প্রথম দিকের তদন্তে গ্রেফতার হওয়া দু’জন তাঁদের ভূমিকা আংশিকভাবে স্বীকার করেছিলেন। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা এমন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছেন যে, এই চুরির পিছনে কোনও ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা গয়না সংগ্রহের অর্ডারদাতা থাকতে পারে।

ল্যুভরের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

এই ডাকাতি শুধু গয়না চুরির ঘটনা নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত বলে বিবেচিত একটি জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

চুরির কয়েক সপ্তাহ আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি গোপন রিপোর্টে ল্যুভরের একাধিক দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে পরবর্তী তদন্তে সামনে আসে। নজরদারি ব্যবস্থা, ক্যামেরা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতার কথাও উঠে আসে।

ঘটনার পর ল্যুভর নিরাপত্তা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে। নতুন নজরদারি ক্যামেরা, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে।

আবার খুলেছে Apollo Gallery, কিন্তু নেই গয়না

চুরির প্রায় নয় মাস পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ল্যুভরের Apollo Gallery আবার দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

কিন্তু সেখানে আর রাজকীয় গয়না রাখা হয়নি। গ্যালারির ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সোনালি অলঙ্করণ দর্শকরা দেখতে পারছেন, তবে মূল্যবান অলঙ্কারগুলি আরও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ল্যুভর কার্যত স্বীকার করেছে যে, আগের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

এক বছর পরও একই প্রশ্ন

২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর মাত্র কয়েক মিনিটের অভিযানে ফরাসি ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ ল্যুভর থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। এক বছর পর চার সন্দেহভাজন জেলে, তদন্ত চলছে, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাগুলিও সতর্ক—কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

ফরাসি রাজপরিবারের সেই অমূল্য গয়নাগুলি এখন কোথায়?

সেগুলি কি এখনও প্যারিসের কোথাও মাটির নিচে বা কোনও গোপন জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে? নাকি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের হাতে পৌঁছে ইতিমধ্যেই আলাদা রত্নে ভেঙে ফেলা হয়েছে?

এক বছর পরেও এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আর যত সময় যাচ্ছে, ঐতিহাসিক অলঙ্কারগুলি অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার উদ্বেগ ততই বাড়ছে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google