বিবাহবিচ্ছেদ, মদ্যপান, প্যানিক অ্যাটাক—জীবনের কঠিন সময়ের কথা জানালেন Yuzvendra Chahal

Yuzvendra Chahalযুজবেন্দ্র চাহাল

ক্রিকেট মাঠে হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মুখ হিসেবেই পরিচিত যুজবেন্দ্র চাহাল (Yuzvendra Chahal)। কিন্তু মাঠের বাইরের জীবনে তাঁকে যে কতটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, তা এবার নিজেই প্রকাশ্যে জানালেন ভারতীয় লেগস্পিনার। সম্প্রতি ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া চাহাল জানিয়েছেন, একটা সময় তাঁর মদ্যপানের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকে একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে ভর্তি হতে হয়েছিল এবং সেখানে ২৬ দিন ছিলেন তিনি।

প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনার আকাশ চোপড়ার সঙ্গে তাঁর ‘Baith & Bol’ পডকাস্টে ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন অধ্যায় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন চাহাল। তিনি জানান, কাউন্টি ক্রিকেট খেলার পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে পেশাদার সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।


চাহালের কথায়, “কাউন্টি ক্রিকেটের পর বিষয়টা সব সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল। তাই আমি রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি হই এবং ২৬ দিন সেখানে ছিলাম। এখন আমি জানি কীভাবে বিষয়টা সামলাতে হয়।”

তাঁর মতে, রিহ্যাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছিল। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার ক্ষেত্রে ওই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

চাহাল জানিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়ের সঙ্গে মদ্যপানের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদের পর পরিস্থিতি সামলানো তাঁর কাছে কঠিন হয়ে উঠেছিল।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় মানসিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই জীবনযাপন চলতে থাকলে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস—ক্রিকেটই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে নিজের জীবনে বড় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

চাহাল জানান, ২০১১ সালে আইপিএলে প্রথমবার খেলার সময় তিনি খুবই তরুণ ছিলেন। সেই সময় দলের পরিবেশে পার্টি বা উদযাপন ছিল স্বাভাবিক বিষয়। ধীরে ধীরে মদ্যপানের অভ্যাস তাঁর জীবনেও জায়গা করে নেয়। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন তারকা এবি ডি ভিলিয়ার্স তাঁকে জীবনে ভারসাম্য রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেও জানান চাহাল। কিন্তু তিনি স্বীকার করেন, কথাটা শুনতে যত সহজ, বাস্তবে জীবনে তা প্রয়োগ করা ততটাই কঠিন।

শুধু মদ্যপানের সমস্যাই নয়, সেই সময় অ্যাংজাইটি এবং প্যানিক অ্যাটাকের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছিল চাহালকে। তিনি জানিয়েছেন, প্যানিক অ্যাটাকের সময় তাঁর হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত। কখনও তাঁর মুখের পেশিতে টান পড়ত, কথা বলতেও সমস্যা হত। পাশে থাকা মানুষরা বুঝতে পারতেন যে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

এই পরিস্থিতিতে তিনি প্রাক্তন বিসিসিআই কোষাধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে কিছুদিনের বিরতি চেয়েছিলেন। চাহালের দাবি, অনিরুদ্ধ তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন এবং সেই সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

জনপ্রিয় ক্রিকেটার হওয়ার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও প্রকাশ্যে নানা আলোচনা ও মন্তব্য হয়েছে। চাহাল জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য এবং ট্রোলিং তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তাঁর কথায়, একজন পাবলিক ফিগার হলে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ঘটনাই আর ব্যক্তিগত থাকে না। মানুষ মন্তব্য করে, সমালোচনা করে, কখনও ট্রোলও করে। কঠিন সময়ের মধ্যে এসব সামলানো তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না।

এই কঠিন সময়ে চাহালের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। পডকাস্টে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষরা সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন। রিহ্যাবের ২৬ দিন এবং পরবর্তী সময়ে নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার ফলে তিনি ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য ফিরে পান বলে জানিয়েছেন।

চাহাল জানান, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পর ক্রিকেটেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাঁর দাবি, গত আইপিএলে শরীর ও মন—দুই দিক থেকেই তিনি অনেক বেশি তরতাজা অনুভব করেছিলেন। জিম, ফিল্ডিং ড্রিল এবং নিয়মিত অনুশীলনে মন দিতে পেরেছিলেন। তাঁর কথায়, সেই সময় নিজেকে যেন আবার ৩০ বছরের মতো মনে হচ্ছিল।

চাহালের কাছে ক্রিকেট শুধু পেশা নয়, জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নিজের সমস্যাগুলি যদি ক্রিকেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেই আশঙ্কাই তাঁকে আরও বেশি করে বদলানোর পথে নিয়ে যায়। তিনি বুঝেছিলেন, ব্যক্তিগত সমস্যার ভার দীর্ঘদিন বয়ে নিয়ে গেলে তাঁর ক্রিকেটজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সাহায্য নেওয়া, রিহ্যাবে যাওয়া এবং নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন।

সম্প্রতি ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন ৩৬ বছর বয়সি চাহাল। ১৭ বছরের রেড-বল ক্রিকেটজীবনে তিনি ১৪৮টি উইকেট নিয়েছেন। তবে ক্রিকেটকে পুরোপুরি বিদায় জানাননি তিনি। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা স্পষ্ট করেছেন এই তারকা লেগস্পিনার। আইপিএলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলারও চাহাল। ১৮৮ ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ২৩৩টি উইকেট।

তাঁর সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। বরং কঠিন পরিস্থিতিতে সমস্যা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় সাহায্য নেওয়া এবং নতুন করে জীবন শুরু করারও একটি বার্তা। চাহাল নিজেই জানিয়েছেন, এখন তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং ভালো জায়গায় রয়েছেন।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google