দেশ জুড়ে ব্যাঙ্কিং সেক্টর সমস্যায় জর্জরিত। এর আগে শোনা গিয়েছিল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার বিপুল পরিমাণে গ্ৰাহকের তথ্য ফাঁস হয়ে গিয়েছে ওয়েব দুনিয়ায়। তবে এখনও তা থেকে বড় কোনও ক্ষতির খবর আসেনি। মাঝে গ্ৰাহকদের টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল এইচডিএডসি ব্যাঙ্কের এক আধিকারিকের বিরুদ্ধে। যা থেকে স্পষ্ট ব্যাঙ্কে টাকা রেখে এখন আর স্বস্তির কোনও জায়গা নেই। যা আবার নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল নয়ডার পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ঘটনা (PNB Fraud)।
বছরের পর বছর ধরে জমানো টাকা হঠাৎ করে অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও! গ্রেটার নয়ডার অইছর এলাকার একটি পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (PNB Fraud) শাখাকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। গ্রাহকদের দাবি, তাঁদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট এবং ফিক্সড ডিপোজিট (FD) থেকে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা কোনও অনুমতি ছাড়াই উধাও হয়ে গিয়েছে।
ঘটনায় ইতিমধ্যেই একাধিক গ্রাহক পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। অভিযোগের পর ব্যাঙ্কের একাধিক কর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারও রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
অভিযোগকারী গ্রাহকদের অনেকেরই দাবি, তাঁরা কোনও টাকা তোলার ফর্মে সই করেননি, কোনও লেনদেনের অনুমোদন দেননি এবং এমনকি টাকা সরানোর আগে বা পরে ব্যাঙ্কের কাছ থেকে কোনও SMS বা সতর্কবার্তাও পাননি।
কেউ কেউ জানান, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নিয়ে তাঁরা ব্যাঙ্কে গিয়ে পাসবুক আপডেট করতে চাইলেও নানা অজুহাতে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স পরীক্ষা করে তাঁরা বুঝতে পারেন, বিপুল পরিমাণ টাকা আর নেই।
প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১৬ থেকে ২৫ জন গ্রাহক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের অধিকাংশই স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মধ্যে হানিফ খান নামে এক ব্যক্তির অভিযোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৯ লক্ষ টাকা ছিল। কিন্তু পরে অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করে তিনি দেখেন, সেই টাকা আর নেই।
হানিফের দাবি, তিনি কোনও লেনদেনের অনুমতি দেননি। এমনকি টাকা সরানোর বিষয়ে কোনও SMS-ও পাননি। তাঁর কথায়, তিনি কোনও নথিতে সই করেননি বা টাকা স্থানান্তরের অনুমোদন দেননি। ফলে কীভাবে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চলে গেল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আরও এক গ্রাহক বিজেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে আগে প্রায় ৮৭ থেকে ৮৮ লক্ষ টাকা ছিল। সেই টাকা মূলত ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁর অ্যাকাউন্টে মাত্র ১ লক্ষ টাকা রয়েছে বলে অভিযোগ। অর্থাৎ কয়েক দশক ধরে তৈরি করা আর্থিক নিরাপত্তার বড় অংশই যেন মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, কয়েকজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা ছিল জমি অধিগ্রহণের বিনিময়ে পাওয়া সরকারি ক্ষতিপূরণ।
বিরোন্ডা গ্রামের ৬০ বছর বয়সি সন্তোষ নামে এক মহিলার অ্যাকাউন্টে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১.২৯ কোটি টাকা জমা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, এর মধ্যে প্রায় ১.১৮ কোটি টাকা আর অ্যাকাউন্টে নেই।
ছেলের টাকা তোলার প্রয়োজন হলে বিষয়টি সামনে আসে। এরপর পরিবারের সদস্যরা ব্যাঙ্কে গিয়ে পরিস্থিতি জানতে চান।
জাকির নামে আরেক গ্রাহকের অভিযোগ, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৯.৫ লক্ষ টাকা উধাও হয়েছে। তাঁর দাবি, টাকা সরানোর বিষয়ে কোনও SMS পাননি তিনি।
ব্যাঙ্কে যাওয়ার পরই নাকি তিনি কথিত অনিয়মের বিষয়টি জানতে পারেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় অঙ্কের লেনদেন হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের মোবাইলে কেন কোনও সতর্কবার্তা পৌঁছল না।
এই ঘটনার অভিযোগ শুধু সেভিংস অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহকদের দাবি, তাঁদের ফিক্সড ডিপোজিট (FD)-এর টাকাতেও অনিয়ম হয়েছে।
কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাঁদের FD ভেঙে টাকা সরানো হয়েছে বলে তাঁরা পরে জানতে পারেন। আবার কয়েকজনের দাবি, অ্যাকাউন্টে থাকা বিপুল অর্থের পরিবর্তে এখন সামান্য টাকা পড়ে রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে অভিযোগ করা হয়েছে, মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এবং কীভাবে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অভিযোগ সামনে আসার পর PNB কর্তৃপক্ষ একাধিক কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, শাখা ব্যবস্থাপক-সহ পাঁচজন ব্যাঙ্ককর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং শাখায় নতুন কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে বেটা-২ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
এই মুহূর্তে তদন্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে—
- গ্রাহকদের অনুমতি ছাড়া কীভাবে টাকা স্থানান্তরিত হল?
- FD ভাঙার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল?
- কোনও OTP বা অনুমোদন প্রয়োজন হয়েছিল কি না?
- গ্রাহকদের মোবাইলে লেনদেনের SMS কেন পৌঁছয়নি?
- ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না?
- এই ঘটনায় ব্যাঙ্কের কতজন কর্মী জড়িত এবং টাকার শেষ গন্তব্য কোথায়?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও তদন্তের অপেক্ষায়।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। অন্যদিকে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অভিযোগের সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত তদন্ত সম্পূর্ণ হয়নি। তাই ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত আর্থিক তছরুপ হিসেবে না দেখে অভিযোগ ও তদন্তাধীন ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গ্রাহকদের কাছে তাঁদের বহু বছরের সঞ্চয় শুধু টাকা নয়—অনেকের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, জমি হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একমাত্র আর্থিক ভরসা। ফলে গ্রেটার নয়ডার এই ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থের বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
