সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতেও রাতে ভালো ঘুমের (Night Sleep) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু শুধু কত ঘণ্টা ঘুমোচ্ছেন, সেটাই শেষ কথা নয়। ঘুমের পরিবেশ কেমন, বিশেষ করে রাতে ঘুমের সময় চারপাশে কতটা আলো রয়েছে, সেটিও স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গবেষকদের দাবি, রাতে কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শে থাকলে হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
European Heart Journal-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। তাতে দেখা গিয়েছে, যাঁরা রাতে তুলনামূলক বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকেন, তাঁদের হৃদযন্ত্রের পেশির গঠন এবং কাজ করার ক্ষমতার সঙ্গে আলোর সংস্পর্শের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে হৃদপেশি পুরু হয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ঘুমের সময় ঘরের আলো, টেবিল ল্যাম্প, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রাস্তার আলো কিংবা জানালা দিয়ে প্রবেশ করা কৃত্রিম আলো—সবই রাতের আলোর সংস্পর্শের উৎস হতে পারে। এতদিন অনেকেই মনে করতেন, পর্যাপ্ত সময় ঘুমোলেই শরীরের প্রয়োজন মিটে যায়। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, ঘুমের সময় চারপাশের পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, রাতে আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাতে বেশি আলোতে থাকা ব্যক্তিদের হৃদযন্ত্রের কয়েকটি অংশে পরিবর্তনের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে।
বিশেষ করে হৃদপেশি পুরু হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হৃদপেশির গঠনে এমন পরিবর্তন হলে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, বেশি রাতের আলোয় থাকা মানুষের হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এই গবেষণা থেকে সরাসরি প্রমাণিত হয় না যে রাতের আলোই হৃদযন্ত্রের সমস্যার একমাত্র কারণ, তবে বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে বিভিন্ন গবেষণাতেও ঘুমের সময় আলোতে থাকার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
কীভাবে রাতের আলো হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে?
মানবদেহের নিজস্ব একটি জৈবঘড়ি রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm)। এই জৈবঘড়ি মূলত ২৪ ঘণ্টার একটি চক্র অনুসরণ করে। কখন ঘুম আসবে, কখন ঘুম ভাঙবে, কখন শরীর সক্রিয় থাকবে, কখন বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হবে—এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এই ব্যবস্থা।
দিনের আলো শরীরকে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে। অন্যদিকে রাতের অন্ধকার শরীরকে বিশ্রাম ও ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। আলো এবং অন্ধকারের এই স্বাভাবিক চক্র শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু রাতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনের উপর কী প্রভাব পড়ে?
রাতে শরীর সাধারণত বিশ্রামের অবস্থায় থাকে। এই সময়ে অনেকের রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে। এটি হৃদযন্ত্রকে বিশ্রাম দেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাতের অতিরিক্ত আলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটালে এই প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে। রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন এবং শরীরের বিপাকীয় কার্যকলাপে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া আলো শরীরের মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। মেলাটোনিন মূলত ঘুম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। রাতে উজ্জ্বল আলো, বিশেষ করে নীল আলো, মেলাটোনিন নিঃসরণ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে এবং ঘুমের গুণমানও খারাপ হতে পারে।
দীর্ঘদিন ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হলে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমানে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখেন, কেউ সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখেন, আবার কেউ বিছানায় শুয়ে দীর্ঘক্ষণ খবর পড়েন।
মোবাইল, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপের পর্দা থেকে নির্গত আলো ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘক্ষণ উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে।
তবে শুধু মোবাইলের আলোই নয়, ঘরের উজ্জ্বল বাতি, টেলিভিশন, নাইট ল্যাম্প এবং বাইরে থেকে আসা রাস্তার আলোও ঘুমের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ করার পাশাপাশি শোওয়ার ঘরের আলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
রাতে ভালো ঘুমের জন্য কী কী করবেন?
হৃদযন্ত্র এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ঘুমের পরিবেশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
১. ঘর অন্ধকার রাখুন: ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঘরের সমস্ত অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ করে দিন। যতটা সম্ভব অন্ধকার পরিবেশে ঘুমোনোর চেষ্টা করুন।
২. মোবাইল থেকে দূরে থাকুন: ঘুমের অন্তত ৩০-৬০ মিনিট আগে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
৩. রাস্তার আলো আটকান: জানালা দিয়ে বাইরের আলো ঘরে প্রবেশ করলে মোটা পর্দা ব্যবহার করতে পারেন।
৪. টেলিভিশন বন্ধ রাখুন: টিভি চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস থাকলে তা বন্ধ করুন। ঘুমের সময় ঘরে টিভির আলো জ্বলে থাকা এড়িয়ে চলুন।
৫. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং সকালে একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন।
৬. আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করুন: শোওয়ার ঘর শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক রাখুন। ঘুমের আগে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলুন।
৭. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতিদিন ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। তবে শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের গুণমানের দিকেও নজর দিতে হবে।
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে ঘুমের গুরুত্ব কতটা?
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব বা অনিয়মিত ঘুম শরীরের উপর একাধিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন গবেষণাটি মনে করিয়ে দিচ্ছে, রাতে ঘুমের সময় চারপাশের আলোও উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। যদিও রাতের আলো এবং হৃদযন্ত্রের পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবু ঘুমের সময় অপ্রয়োজনীয় আলো এড়িয়ে চলা একটি ভালো অভ্যাস।
দিনের শেষে সুস্থ থাকার জন্য শুধু বিছানায় বেশি সময় কাটানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভালো ঘুম, সঠিক পরিবেশ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। তাই আজ থেকেই ঘুমের ঘরটিকে যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখার অভ্যাস তৈরি করুন। আপনার হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য এই ছোট পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তথ্যসূত্র: European Heart Journal-এর প্রকাশিত গবেষণা।
