Online Shopping-এ কী কী নতুন নিয়ম আনছে নতুন ভোক্তা সুরক্ষা আইন ২০২৬, জেনে নিন

Online Shopping

অনলাইন শপিং (Online Shopping) উন্নত হওয়ার ফলে মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই প্রায় যে কোনও কিছু কেনা এখন হাতের মুঠোয়। তবে এই সুবিধার সঙ্গে এমন কয়েকটি ঝুঁকিও জড়িয়ে রয়েছে, যা সহজেই কেনার সময় আমরা উপেক্ষা করে থাকি। অনলাইনে করা প্রতিটি কেনাকাটাই একটি ডিজিটাল তথ্য রেখে যায়। এর মধ্যে আপনার নাম, ফোন নম্বর, ডেলিভারি অ্যাড্রেস, লগ-ইন সংক্রান্ত তথ্য এবং পেমেন্ট বা অর্থপ্রদানের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ভারতের নতুন ‘ভোক্তা সুরক্ষা (ই-কমার্স) (সংশোধনী) বিধিমালা, ২০২৬’—যা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে—তার লক্ষ্য হল অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে আরও স্বচ্ছ করে তোলা। এই বিধিমালায় পণ্যের দাম, বিক্রেতা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ, সার্চ র‍্যাঙ্কিং, বিজ্ঞাপন, ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ (ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত করার কৌশল), গ্রাহকের তথ্য এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করা হয়েছে।


তবে অধিক স্বচ্ছতা মানেই সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হওয়া নয়। বিশেষজ্ঞের মতে,  একজন ক্রেতা বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করার পরেও ফিশিং লিংকের (প্রতারণামূলক লিংক) শিকার হতে পারেন। এমনকি কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মটি নির্ভরযোগ্য বা বৈধ হলেও, কোনও অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সেখানে সংরক্ষিত ঠিকানা ও পেমেন্টের তথ্য বেহাত হয়ে যেতে পারে।

এর ফলে সাধারণ “Buy Now” (এখনই কিনুন) বোতামটি যতটা সাধারণ মনে হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেনাকাটার অপশনে ক্লিক করার আগে ক্রেতাদের সাতটি মৌলিক বিষয় যাচাই করে নেওয়া উচিত:-

১. পণ্যটি আসলে কে বিক্রি করছেন তা যাচাই করুন

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে বিক্রেতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—যেমন ব্যবসার বিবরণ, ঠিকানা, গ্রাহক সেবার তথ্য এবং রেটিং—প্রদান করতে হবে। শুধুমাত্র পণ্যের ছবি বা পর্যালোচনার (রিভিউ) ওপর নির্ভর করবেন না। বিশেষ করে দামি গ্যাজেট, ব্র্যান্ডের পণ্য বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী কেনার সময় বিক্রেতার বিবরণ যাচাই করে নিন। কোনও পণ্যের পেজ দেখতে আসল বা নির্ভরযোগ্য মনে হলেই যে বিক্রেতাও নির্ভরযোগ্য হবেন, এমন কোনও কথা নেই।

২. নিজের তথ্য দেওয়ার আগে পেমেন্ট পেজটি যাচাই করুন

কার্ডের তথ্য, ইউপিআই (UPI) ক্রেডেনশিয়াল বা অন্য কোনও আর্থিক তথ্য দেওয়ার আগে ওয়েবসাইটের ঠিকানাটি দেখে নিন। পেমেন্ট পেজটি অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত প্ল্যাটফর্ম বা কোনও বৈধ ও অনুমোদিত পেমেন্ট প্রসেসরের হতে হবে। যদি হঠাৎ আপনাকে অন্য কোনও ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া (রিডাইরেক্ট করা) হয়, তবে সতর্ক হোন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিক্রেতা বা কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া কোনোও ব্যক্তির কাছে কখনওই আপনার ওটিপি (OTP), ইউপিআই পিন, কার্ডের পিন বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করবেন না। পেমেন্ট সংক্রান্ত রিডাইরেকশনের বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কোনও লেনদেনের সময় যদি হঠাৎ এমন কোনও তথ্যের (ক্রেডেনশিয়াল) প্রয়োজন হয় যা সাধারণত কেনাকাটা সম্পন্ন করতে লাগে না, তবে ক্রেতার উচিত সেই প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেওয়া।

৩. সার্চ রেজাল্টের তালিকার শীর্ষে থাকা মানেই নিরাপদ—এমনটা ধরে নেবেন না

নতুন ই-কমার্স নীতিমালায় প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে সার্চ রেজাল্ট বা ফলাফলের ক্রম (র‍্যাঙ্কিং) নির্ধারণ করবে, সে বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে সার্চ রেজাল্ট বা ইনডেক্স পরিবর্তন করতে পারবে না যা ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে বা ফলাফলের প্রাসঙ্গিকতাকে প্রভাবিত করে। র‍্যাঙ্কিংকে প্রভাবিত করে এমন প্রধান বিষয়গুলো সম্পর্কেও তাদের তথ্য প্রদান করতে হবে। তবে এরপরও ক্রেতাদের নিজস্ব যাচাই-বাছাই করা উচিত। বিক্রেতা, রিভিউ এবং পণ্যের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখুন। কেনাকাটা সম্পন্ন করার আগে পেমেন্ট কোথায় করা হচ্ছে তা যাচাই করুন। যদি কোনও বিক্রেতা আপনাকে প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে অন্য কোথাও পেমেন্ট করতে বলেন, তবে বিষয়টিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করুন।

৪. কোনও লিস্টিং বা তালিকাটি পেইড বিজ্ঞাপন কি না তা জানুন

সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, স্পনসরড বা অর্থপ্রদত্ত লিস্টিংগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে। কেনাকাটার সার্চ রেজাল্টের শীর্ষে কোনও পণ্য দেখা গেলেই যে সেটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। স্পনসরড লিস্টিং মূলত একটি বিজ্ঞাপন। এর মানে এই নয় যে বিক্রেতা, পণ্য বা অফারটি নির্ভরযোগ্য। লিস্টিংটি স্পনসরড কি না তা যাচাই করুন, বিক্রেতার তথ্য নিশ্চিত করুন এবং বিজ্ঞাপনের পাশে দেখা যাচ্ছে বলেই কোনও অজানা ফাইল বা লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন।

৫. ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ এবং অদ্ভুত রিডাইরেক্ট বা পুনর্নির্দেশনা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন

‘ডার্ক প্যাটার্ন’ গ্রাহকদের এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করতে পারে যা হয়তো তারা আসলে নিতে চাননি। এর মধ্যে থাকতে পারে অবাঞ্ছিত পরিষেবা, অতিরিক্ত খরচ বা বিভ্রান্তিকর সব বিকল্প। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক ২০২৩ সালের নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। এছাড়া বার্ষিক স্ব-মূল্যায়ন এবং কমপ্লায়েন্স বা নিয়ম-কানুন মেনে চলার সনদ প্রদর্শনের বিষয়টিও এই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত।

এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। অস্বাভাবিক পপ-আপ (pop-up), অপ্রত্যাশিত রিডাইরেক্ট এবং হঠাৎ আসা “পেমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে” (payment failed)-এর মতো বার্তা—যেখানে আপনাকে পুনরায় লগইন বা ব্যক্তিগত তথ্য (credentials) দিতে বলা হয়—সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। বিভ্রান্তিকর ইন্টারফেস মানেই যে সবসময় কোনও সাইবার আক্রমণ, তা নয়; তবে সংবেদনশীল তথ্য চেয়ে হঠাৎ কোনও অনুরোধ এলে গ্রাহকদের থমকে দাঁড়ানো এবং আসলে কী ঘটছে তা যাচাই করে দেখা উচিত।

৬. প্ল্যাটফর্মটি কী ধরনের তথ্য চাইছে, তা যাচাই করুন

অনলাইন কেনাকাটার জন্য কিছু ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন বা চেকআউটের সময় চাওয়া সব তথ্যই যে লেনদেনের জন্য জরুরি, তা নয়। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগৃহীত তথ্যের ব্যবহার সংক্রান্ত নিয়মাবলী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; এর মধ্যে তথ্যের নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

অ্যাকাউন্ট তৈরি বা কোনও লেনদেন সম্পন্ন করার আগে দেখে নিন কী ধরনের তথ্য চাওয়া হচ্ছে এবং কেন চাওয়া হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। এছাড়া, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করে কেনাকাটার অ্যাকাউন্টের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

৭. লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড বা নথিপত্র সংরক্ষণ করুন

পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমেই নিরাপত্তার বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। ইনভয়েস (চালান), অর্ডারের নিশ্চিতকরণ বার্তা, পেমেন্টের রসিদ, পণ্যের বিবরণ এবং বিক্রেতার সঙ্গে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বা বার্তাগুলো সংরক্ষণ করুন। লেনদেন নিয়ে কোনও বিরোধ বা জটিলতা দেখা দিলে এই নথিপত্রগুলো কাজে আসতে পারে।

সংশোধিত নিয়মাবলীতে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকেও আরও জোরদার করা হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের (গ্রিভেন্স অফিসার) ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করতে হবে এবং অভিযোগের একটি লিখিত বা সংরক্ষিত অনুলিপি প্রদান করতে হবে। সরকার আরও জানিয়েছে যে, ই-কমার্স কোম্পানিগুলো ‘ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইন কনভারজেন্স’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০২৫ সালে ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইনে মোট ১৭,৭১,৬২২টি অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই ছিল ই-কমার্স সংক্রান্ত।

নতুন নিয়মগুলো ডিজিটাল বাণিজ্যকে আরও স্বচ্ছ করে তোলার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে সরকারি বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কখনওই ক্রেতার নিজস্ব সতর্কতার বিকল্প হতে পারে না। অনলাইনে কেনাকাটার বিষয়টি কেবল পণ্য পছন্দ করা এবং তার মূল্য পরিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত। ক্রেতারা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করেন, অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন, পেমেন্টের অনুমোদন দেন এবং ডিজিটাল সিস্টেমের সঙ্গে নানাভাবে মিথস্ক্রিয়া বা যোগাযোগ করেন।

বিক্রেতাকে যাচাই করা, পেমেন্টের ইউআরএল (URL) নিশ্চিত করা, স্পনসরড লিস্টিং শনাক্ত করা এবং অস্বাভাবিক রিডাইরেক্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা—এসব করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগতে পারে। এই কয়েক সেকেন্ডই একটি সাধারণ অনলাইন কেনাকাটাকে সাইবার নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় পরিণত হওয়া থেকে আটকাতে পারে।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: FacebookTwitterGoogle