চুল কাটার পর ঘাড়ের আরামদায়ক ম্যাসাজ (Massage After Haircut)—যা প্রায়শই বিনামূল্যে দেওয়া হয়—এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও তৃপ্তিদায়ক মুহূর্ত, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তবে অনেক সেলুনে এই ম্যাসাজটি যতটা আরামদায়ক হওয়ার কথা, বাস্তবে তা ততটা নয়। এতে সাধারণত ঘাড় দ্রুত মোচড়ানোর বা ঝাঁকানোর মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়, যার ফলে হাড়ের মড়মড় শব্দ শোনা যায়। অনেকে মনে করেন এই ম্যাসাজ ক্ষতিকর নয় এবং এতে সতেজতা পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবে এর পরিণতি জীবন বদলে দেওয়ার মতো ভয়াবহ হতে পারে। ভারতে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা মানুষের বিপুল ক্ষতি করেছে। কখনও কখনও ঘার ভেঙে যাওয়ার মমতো ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া এর মধ্যে রয়েছে পক্ষাঘাত, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুর ক্ষতি এবং এমনকি মৃত্যুও।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সেলুনগুলোতে চুল কাটা বা শেভ করার পর ঘাড় মটকে দেওয়াটা এক প্রথাগত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে; এটিকে আরাম ও মানসিক চাপ কমানোর উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়। এর পেছনে চিকিৎসাগত কোনও ভিত্তি নেই, বরং এটি মূলত অভিজ্ঞতানির্ভর একটি বিষয়। যা মাঝে মাঝে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।
আঙুলের গাঁট ফোটানোর মতোই ঘাড় মটকে দেওয়ার সময় যে জোরালো শব্দ হয়, তা গ্রাহকদের কাছে তৃপ্তিদায়ক মনে হয়। এটি এখন এমন এক প্রত্যাশিত রীতিতে পরিণত হয়েছে যে গ্রাহকরা নিজেরাই এর জন্য অনুরোধ করেন। সমস্যা হল, ঘাড়ের গঠন বা অ্যানাটমি সম্পর্কে নাপিতদের কোনও প্রশিক্ষণ থাকে না। কাইরোপ্র্যাক্টর বা ফিজিওথেরাপিস্টরা যেভাবে ঘাড় ঘোরানোর বা মোচড়ানোর কৌশল প্রয়োগ করেন, নাপিতরাও অনেকটা তেমনই হঠাৎ করে ঘাড়ের ওপর বল প্রয়োগ করেন। কিন্তু পেশাদার চিকিৎসকরা দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন ধরনের কৌশল নিরাপদ—তা সম্পর্কে যে ক্লিনিক্যাল জ্ঞান অর্জন করেন, নাপিতদের সেই জ্ঞান বা দক্ষতা থাকে না।
এরকম ম্যাসাজ নেওয়ার পর যদি তা ক্ষতি করে তাহলে বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে মানুষের শরীরে, সেই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেটা দেখে নেওয়া যাক-
১) মুখ বা শরীরের একপাশে হঠাৎ অসাড়তা, দুর্বলতা বা অবশ ভাব (পক্ষাঘাত)
২) অস্পষ্ট কথা বলা, কথা বলতে অসুবিধা বা মানসিক বিভ্রান্তি
৩) হঠাৎ মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা বা দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন
৪) হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা বা ঘাড়ের কোনও নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা
এসব লক্ষণ দেখা দিলে তা নিজে থেকে সেরে যাবে কি না—সেজন্য অপেক্ষা না করে এটিকে জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সেই সময় আক্রান্ত ব্যক্তির নিজে গাড়ি চালানো কিংবা শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া আরও ক্ষতিকর হতে পারে। বরং তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে এমন কোনও হাসপাতালে যেখানে স্ট্রোকের চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি মাথা ঘোরা বা কথা বলার ধরনে সামান্য পরিবর্তনের মতো অস্পষ্ট বা মৃদু লক্ষণ দেখা দিলেও একই দিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ ধমনী ছিঁড়ে যাওয়া বা ‘ডিসেকশন’-এর লক্ষণগুলো শুরুতে খুব সামান্য মনে হলেও তা ক্রমশ গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে-
১. ধমনী ছিঁড়ে যাওয়া ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের জন্য দু’টি প্রধান ধমনী—যাদের ‘ভার্টিব্রাল আর্টারি’ বলা হয়—ঘাড়ের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। নাপিতের দেওয়া হঠাৎ ও জোরালো মোচড়ের ফলে এই রক্তনালীগুলো অতিরিক্ত প্রসারিত হয়ে ছিঁড়ে যেতে পারে। এই ছিঁড়ে যাওয়া অংশের কারণে ধমনীর দেওয়ালে রক্ত জমা হয়ে রক্ত জমে যেতে পারে। যদি সেই জমাট বাঁধা রক্ত সরে গিয়ে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তবে ‘ইসকেমিক স্ট্রোক’ হতে পারে; এটি চুল কাটার পরপরই অথবা কয়েক দিন পরেও ঘটতে পারে।
২. স্নায়ুর ক্ষতি ও স্থায়ী পক্ষাঘাত
মেরুদণ্ড ঘাড়ের হাড়ের মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত থাকে এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব স্নায়ু ছড়িয়ে পড়ে; অসতর্ক বা রুক্ষভাবে নাড়াচাড়ার ফলে এগুলোর ক্ষতি হতে পারে।
ফ্রেনিক নার্ভ বা স্নায়ুর ক্ষতি: এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে নাপিতের মাধ্যমে ঘাড় মটকাতে গিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী ‘ফ্রেনিক নার্ভ’ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ডায়াফ্রামে পক্ষাঘাত ঘটতে পারে এবং রোগী ভেন্টিলেটরে চলে যেতে পারে। হঠাৎ মোচড় দেওয়ার ফলে মেরুদণ্ডের কোনও ডিস্ক সরে গিয়ে বা আর্থ্রারাইটিসজনিত সমস্যার কারণে হাড়ের কোনও অংশ মেরুদণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে হঠাৎ অসাড়তা বা পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে।
৩. অতিরিক্ত নমনীয়তা ও জয়েন্টে আঘাত
ঘাড় মটকানো, বিশেষ করে জোরালোভাবে মটকানোর ফলে লিগামেন্টগুলো স্থায়ীভাবে প্রসারিত হয়ে যেতে পারে। এতে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘাড়ের ব্যথা, পেশির খিঁচুনি ও অল্প বয়সে আর্থ্রারাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
