Floating National Park, যা রয়েছে এই ভারতেই, জানেন কোথায়

জাতীয় উদ্যান মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জঙ্গল, পাহাড় কিংবা বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। কিন্তু ভারতের মণিপুরে রয়েছে এমন এক জাতীয় উদ্যান, যার ভূমিই ভাসমান। লোকটাক হ্রদের ওপর গড়ে ওঠা কেইবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান (Floating National Park) হিসেবে পরিচিত।

মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় অবস্থিত এই উদ্যানের বিশেষত্ব শুধু তার অবস্থানেই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিরল সাঙ্গাই হরিণ, মণিপুরের রাজ্য পশু এবং এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতীক।


জলের ওপর ভাসমান ‘ভূমি’

কেইবুল লামজাওয়ের বিস্তীর্ণ অংশ তৈরি হয়েছে ‘ফুমদি’ নামে পরিচিত ভাসমান উদ্ভিদস্তর দিয়ে। জলজ উদ্ভিদ, ঘাস, মাটি ও পচনশীল জৈব উপাদান দীর্ঘ সময় ধরে জমে তৈরি হয় এই ফুমদি। কোথাও এগুলি এতটাই পুরু যে তার ওপর বন্যপ্রাণী অনায়াসে চলাফেরা করতে পারে।

ফলে লোকটাক হ্রদের জলরাশির মাঝেই তৈরি হয়েছে এমন এক প্রাকৃতিক আবাসস্থল, যা স্থলভূমির মতো দেখালেও আসলে ভাসমান।

সাঙ্গাইয়ের নিরাপদ আশ্রয়

এই উদ্যানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে সাঙ্গাই হরিণের নাম। অত্যন্ত বিরল এই হরিণ মণিপুরের রাজ্য পশু এবং রাজ্যের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

ফুমদির নরম ও দুলতে থাকা জমির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সাঙ্গাইয়ের চলাফেরা প্রকৃতির এক চমৎকার অভিযোজনের উদাহরণ। এই ভাসমান তৃণভূমিই তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাস।

সাঙ্গাই ছাড়াও উদ্যান ও সংলগ্ন জলাভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, মাছ, জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদের দেখা মেলে। শীতকালে পরিযায়ী পাখির উপস্থিতিও এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।

Floating National Park

লোকটাকের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

কেইবুল লামজাওকে লোকটাক হ্রদ থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। হ্রদের জলস্তর, জলজ উদ্ভিদ এবং ফুমদির গঠন—সবকিছুর ওপরই এই উদ্যানের পরিবেশ নির্ভরশীল।

অন্যদিকে লোকটাক হ্রদ মণিপুরের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। মাছ ধরা, জলজ সম্পদ এবং পর্যটন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে হ্রদটি স্থানীয় মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই হ্রদের পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে কেইবুল লামজাওয়ের ওপরও।

সংরক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জ

এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। জলস্তরের পরিবর্তন, দূষণ, মানুষের নানা কর্মকাণ্ড এবং জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন—সবই ফুমদি ও বন্যপ্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে সাঙ্গাইকে রক্ষা করতে হলে শুধু প্রাণীটির ওপর নজর দিলেই হবে না; তার আবাসস্থল, অর্থাৎ ফুমদি ও লোকটাকের জলাভূমি পরিবেশকেও সুস্থ রাখতে হবে।

Floating National Park

প্রকৃতির এক বিরল সহাবস্থান

কেইবুল লামজাও তাই নিছক একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি জলাভূমি, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর পারস্পরিক নির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। জলের ওপর ভাসমান ভূমিতে একটি জাতীয় উদ্যানের অস্তিত্বই দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতি কত বিচিত্র উপায়ে জীবনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

লোকটাকের নীল জলরাশি, তার ওপর ভাসমান ফুমদি আর সেই সবুজ ভূমিতে বিচরণরত সাঙ্গাই—এই দৃশ্য মণিপুরের নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিচয়ের অংশ। কেইবুল লামজাওকে সংরক্ষণ তাই শুধু একটি বিরল হরিণকে রক্ষা করা নয়; রক্ষা করা একটি সম্পূর্ণ জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র এবং ভারতের অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে। এই জাতীয় উদ্যান ঘিরে ভ্রমার্থীদের আকর্ষণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে, যে কারণে চিন্তা আরও বেড়েছে।

কী ভাবে যাবে ভাসমান জাতীয় উদ্যানে

ভাসমান জাতীয় উদ্যান বলতে কেইবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান-কেই বোঝানো হয়। এটি মণিপুরের লোকটাক হ্রদের ওপর অবস্থিত বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান এবং সাঙ্গাই হরিণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন?

১. কলকাতা → ইম্ফল ✈️
কলকাতা থেকে বিমানে বীর টিকেন্দ্রজিৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ইম্ফল যেতে হবে। এটিই কেইবুল লামজাও যাওয়ার প্রধান বিমানপথ।

২. ইম্ফল → ময়রাং/লোকটাক 🚗
ইম্ফল থেকে সড়কপথে প্রায় ৪৮–৫৩ কিলোমিটার দূরে লোকটাক হ্রদ ও কেইবুল লামজাও এলাকা। গাড়ি বা ট্যাক্সি নিয়ে ময়রাং হয়ে যেতে পারেন।

৩. ময়রাং → কেইবুল লামজাও
ময়রাং থেকে জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথে স্থানীয় গাড়ি/অটোতে যাওয়া যায়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পার্কটি লোকটাক হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত।

🚤 পার্কটি কীভাবে ঘুরবেন?

পার্কের ভাসমান ‘ফুমদি’ অঞ্চল ও সাঙ্গাই হরিণ দেখতে স্থানীয় নৌকা/বোটের ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পার্কে বন দফতরের ওয়াচটাওয়ারও রয়েছে।

একটি সহজ পরিকল্পনা:
কলকাতা → ইম্ফল → ময়রাং → কেইবুল লামজাও → লোকটাক লেক/সেন্দ্রা → ইম্ফল

লোকটাক লেক ইম্ফল থেকে প্রায় ৪৮ কিমি দূরে এবং সেন্দ্রা থেকে হ্রদের সুন্দর প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google