শুক্রবার বেঙ্গালুরুর শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে র্যাঙ্কিংয়ে ৪৪তম স্থানে থাকা পানামার বিপক্ষে ৬৮ মিনিট পর্যন্ত ভারতের (India vs Panama) পুরুষ ফুটবল দল এমন এক গল্পই যেন রচনা করতে চলেছিল; তবে শেষ পর্যন্ত তাদের ১-১ ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অল্পের জন্য ইতিহাস রচনা হল না।
বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যাটা হয়তো কিছুটা বিষণ্ণভাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু খালিদ জামিলের দল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে মুডটাই বদলে দিল। এর ফলে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচগুলোর আগে দলটির আত্মবিশ্বাস ও মনোবল নিঃসন্দেহে বেড়ে গেল।
দলে পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোচ খালিদ জামিল এই বছরের শুরুর দিকে ‘ইউনিটি কাপ’-এ দেখা ‘ব্যাক-ফাইভ’ (পাঁচজন ডিফেন্ডারের) কৌশলটি বাদ দিয়ে নতুন এক ‘ব্যাক-ফোর’ (চারজন ডিফেন্ডারের) ছক বেছে নেন; যার কেন্দ্রে আনোয়ার আলি ও বিজয় ভার্গিসের জুটি বেশ সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে। এবং প্রধান কোচের এই কৌশলগত পরিবর্তনটি বিশেষ করে আক্রমণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়।
যদিও লংপাস নির্ভর খেলায় রক্ষণভাগে একজন বাড়তি খেলোয়াড় থাকায় আশিক কুরুনিয়ান ও বিক্রম প্রতাপ সিং মাঠের দুই প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্রসগুলোকে কাজে লাগাতে। সক্ষণ হন।
ম্যাচের প্রথমার্ধে কুরুনিয়ানের গতি বেশ কয়েকবার পানামার অধিনায়ক সিজার ব্ল্যাকম্যানকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল। তাঁর একটি জোরালো দৌড় ভারতকে প্রায় এগিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু বক্সের ভেতর কুরুনিয়ানের দেওয়া নিচু ক্রসটি ভারতের দুই ফরোয়ার্ড—মনবীর সিং ও রায়ান উইলিয়ামস—অল্পের জন্য ধরতে ব্যর্থ হন।
তবে সেই আক্রমণটিই জামিলের শিষ্যদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করা সম্ভব—বিশেষ করে যখন পানামার তিনজন ডিফেন্ডারই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক করছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে উপস্থিত স্থানীয় দর্শকরা খেলার মোড় ঘোরার অপেক্ষায় ছিলেন। প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল এবং এমনকি মরিয়া ক্লিয়ারেন্স গ্যালারিকে প্রথম থেকেই মাতিয়ে দিয়েছিল।
যখন মনে হচ্ছিল ভারত হয়তো কষ্টার্জিত ড্র নিয়ে বিরতিতে যাবে, ঠিক তখনই রায়ান উইলিয়ামস ম্যাচের আবহ পুরোপুরি বদলে দেন। ঘটনাটি শুরু হয়েছিল মাঠের অপর প্রান্তে আকাশ মিশ্রর নেওয়া একটি সাধারণ ‘শর্ট থ্রো’ থেকে। কিন্তু পানামার রক্ষণভাগ প্রস্তুত ছিল না যে এই লেফট-ব্যাক তাঁর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ডান পা দিয়ে বলটি তাদের মাথার ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেবেন।
পানামার অর্ধে একমাত্র উইলিয়ামসই সেই লম্বা বলটির জন্য আগেভাগে প্রস্তুত ছিলেন, ফলে বক্সের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট সময় পেয়ে যান। আর ৩২ বছর বয়সী উইলিয়ামস নিচের ডানদিকে কোণা দিয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়ে বলটি জালে জড়িয়ে দেন।
পানামা মূলত বল মাটিতে রেখেই খেলার চেষ্টা করছিল। ডিফেন্ডার জোসেফ জোন্স কর্ডোবা ধারাবাহিকভাবে বল পাস করলেও পানামার উইঙ্গাররা ফুলব্যাক অভিষেক টেকচাম ও আকাশের রক্ষণব্যূহ ভেদ করতে গিয়ে যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে বার বার ধাক্কা খেলেন। আর যখনই সেই রক্ষণব্যূহ ভেদ করা সম্ভব হয়েছে, তখন গুরপ্রীত সিং সান্ধুর সুউচ্চ ও বলিষ্ঠ উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যেন প্রতিপক্ষের নামের পাশে স্কোরবোর্ডে ‘শূন্য’ই লেখা থাকে।
দ্বিতীয় অর্ধে ভারত তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থিরভাবেই খেলা শুরু করে এবং অপ্রয়োজনীয় ট্যাকল বা চ্যালেঞ্জ থেকেও বিরত থাকে। অন্যদিকে, পানামা কিছুটা বোঝাপড়ার অভাবে ভুগছিল, বল নিজেদের দখলে রাখলেও তারা মূলত পাস খেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং দূরপাল্লার শটের ওপর নির্ভর করছিল।
যখন কোনও দল এমন দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষণভাগ সামলায়, তখন সেই অচলাবস্থা ভাঙতে প্রয়োজন হয় বিশেষ কিছুর—আর ওমর ভ্যালেন্সিয়ার গোলটি ছিল ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত। ভারতের অর্ধে বলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে পানামার আক্রমণটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল; কিন্তু বলটি এমনভাবে উঠে আসে যা বদলি খেলোয়াড় ভ্যালেন্সিয়ার জন্য আদর্শ সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাঁর নেওয়া ভলিটি বাঁক নিয়ে জালে জড়িয়ে যায় এবং গোলরক্ষক গুরপ্রীত যেন অসহায় দর্শকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
তবে এই গোল ভারতের মনোবল দমাতে পারেনি। জামিল নতুন খেলোয়াড়দের মাঠে নামানোয় দলের খেলার গতি ও তীব্রতা ফিরে আসে; মনবীর ও এডমুন্ড লালরিনডিকা যদি ফিনিশিংয়ে আরও নিখুঁত হতেন, তবে ভারত হয়তো জয় তুলেই নিতে পারত। বিশেষ করে খেলার শেষ মুহূর্তে এডমুন্ডের ফাঁকা পোস্টে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাটি নিশ্চিতভাবেই তাঁকে বেশ কিছুদিন যন্ত্রণা দেবে।
তবুও, ভারত শক্তিশালীভাবেই ম্যাচটি শেষ করে এবং এমন এক ফলাফল তুলে নেয় যা কাগজে-কলমে অসম্ভব মনে হয়েছিল—বিশ্বকাপ খেলা একটি দলের বিপক্ষে ড্র করে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের দুই বড় শক্তির মুখোমুখি হওয়ার আগে এই ফলাফলটি নিঃসন্দেহে তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
