ISL 2026-27: “তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পর জিদানকে সরে যেতে হয়েছিল, সেখানে আমি কে”

সুচরিতা সেন চৌধুরী: জয়ের হ্যাটট্রিক তো হয়েছেই সঙ্গে লিগ টেবিলের শীর্ষেও পৌঁছে গিয়েছে দল। যা আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকার জন্য শেষ কথা। কিন্তু দলের ফুটবল কি আদৌ ততটাও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মতো ছিল শেষ তিন ম্যাচে? প্রশ্নটা থাকছেই।  সঙ্গে পড়তে হচ্ছে সমালোচনার মুখেও। তবে এই সমালোচনাকে একজন পেশাদার কোচ হিসেবেই নিচ্ছেন তিনি সঙ্গে উদাহরণ টেনে আনছেন জিনেদিন জিদানের। এর সঙ্গে মোহনবাগান কোচ অবশ্য সাবধানী, বলছেন এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। আইএসএল ২০২৬-২৭ (ISL 2026-27)-এ ঘরের মাঠে ওড়িশা এফসির বিরুদ্ধে এই ম্যাচের পরই লম্বা আন্তর্জাতিক ব্রেকে যাবে দলগুলো। তার আগে তিন পয়েন্ট ছাড়া আর কিছু ভাবছে না দিমপেরিস।

সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছে সবুজ-মেরুন। কিন্তু বারবার প্রতিপক্ষকে প্রথমে গোল করার সুযোগ দেওয়া যে দলের জন্য চিন্তার বিষয়, তা স্বীকার করে নিয়েছেন কোচ। তাই আগামী ম্যাচে শুরু থেকেই আরও সতর্ক, আগ্রাসী এবং মনোযোগী ফুটবল খেলতে চান তিনি। অন্যদিকে, রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা রাহুল জানিয়েছেন, দলের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ফিটনেস ধরে রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


ম্যাচের শুরু থেকেই আগ্রাসী হতে চায় মোহনবাগান

শেষ কয়েকটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছে মোহনবাগানকে। কোচের মতে, এই পরিস্থিতি এড়াতে ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে ফুটবলারদের। শুধু প্রথমার্ধের শুরু নয়, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও তা ধরে রাখা জরুরি।

বিশেষ করে ঘরের মাঠে খেললে শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের উপর চাপ তৈরি করতে চান তিনি। দ্রুত গোল করতে পারলে প্রতিপক্ষের রক্ষণাত্মক ছক ভেঙে দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন কোচ। তাঁর পরিকল্পনা, শুরুতেই গোলের সুযোগ তৈরি করে প্রতিপক্ষকে নিজেদের কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করা।

তবে মাঝমাঠে দু’জন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ডাবল এইট খেলানোর পরিকল্পনা নিয়ে এখনই কিছু বলতে চাননি তিনি। ওড়িশার মাঝমাঠ বেশ জমাট হওয়ায় এই কৌশল কার্যকর হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কোচ জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের কৌশল এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বিচার করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাহালের চোটে চিন্তা, ফিরছেন ম্যাকা

ম্যাচের আগে মোহনবাগানের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ চোট সমস্যা। কোচ জানিয়েছেন, গত ম্যাচে পাওয়া সাহালের হাঁটুর চোটের কারণে এই ম্যাচে তাঁকে পাওয়া যাবে না। মিগুয়েলের অনুপস্থিতিও দলের সৃজনশীল ফুটবলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে স্বস্তির খবর, জেমি ম্যাকলারেন আবার দলের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন। তাঁকে আসন্ন ম্যাচের স্কোয়াডে পাওয়ার আশা করছেন কোচ।

একই সঙ্গে দলের ফুটবলারদের বারবার চোট পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত আগ্রাসী ট্যাকল এবং রেফারির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলাররা চোট পেলে গোটা দলের পরিকল্পনাতেই প্রভাব পড়ে।

সাহাল ও মিগুয়েলের মতো সৃজনশীল ফুটবলারদের না পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। তবে এই মুহূর্তে পরবর্তী ম্যাচের বাইরে অন্য কোনও বিষয় নিয়ে ভাবতে রাজি নন কোচ। তাঁর কথায়, আগে তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করতে হবে, তার পরে আন্তর্জাতিক বিরতি এবং চার্চিল ব্রাদার্স ও ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ নিয়ে ভাবা যাবে।

গোলের সুযোগ কাজে লাগানোই বড় চ্যালেঞ্জ

পঞ্জাব এফসির বিরুদ্ধে ২-১ গোলে জিতলেও আক্রমণভাগের পারফরম্যান্স নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন মোহনবাগান কোচ। দ্বিতীয়ার্ধে একাধিকবার গোল করার কাছাকাছি পৌঁছেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি ফুটবলাররা।

এই সমস্যা কাটাতে অনুশীলনে ফিনিশিং এবং গোলের সামনে মনোযোগ ধরে রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোচের মতে, কিছু ফুটবলারের ক্ষেত্রে গোল করার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া প্রয়োজন। আবার বাইরের সমালোচনা এবং প্রত্যাশার চাপও তাঁদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই ফুটবলারদের স্বাভাবিকভাবে খেলতে এবং গোলের সুযোগের সময় আরও আত্মবিশ্বাসী হতে বলেছেন তিনি।

সমর্থকদের সমালোচনা নিয়ে কী বললেন কোচ?

দল ধারাবাহিকভাবে জিতলেও কোচের ফুটবল দর্শন এবং খেলার ধরন নিয়ে সমর্থকদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে নিয়মিত। এই প্রসঙ্গে কোচ স্পষ্ট জানিয়েছেন, সমর্থক এবং সাংবাদিকদের নিজেদের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে।

তবে দলের জন্য তিনি প্রতিদিন সর্বোচ্চ পরিশ্রম করছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নিজের ভুলত্রুটির কথা স্বীকার করে তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি ম্যাচের আগে কোচ হিসেবে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সব সিদ্ধান্ত যে সঠিক হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

উদাহরণ হিসেবে জিনেদিন জিদানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পরেও রিয়াল মাদ্রিদে জিদানকে একসময় বিদায় নিতে হয়েছিল। আমি তো সেক্ষেত্রে কেউ নই। সমালোচনা এবং ফলাফলের চাপ স্বাভাবিক। তাই সেটাকে মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। কিছুই নিশ্চিত নয়।

জেসাস দে মিগুয়েলের মৃত্যুতে শোক, ফুটবলের আগে জীবন

স্প্যানিশ ফুটবলার জেসাস দে মিগুয়েলের মাঠে সংঘর্ষের পর মৃত্যুর খবরেও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মোহনবাগান কোচ। তিনি জানিয়েছেন, একজন প্রাক্তন গোলকিপার হিসেবে এমন পরিস্থিতির গুরুত্ব তিনি বোঝেন। ফুটবল খেলতে গিয়ে কখনও কখনও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু খেলোয়াড়দের মনে রাখতে হবে, মাঠের বাইরে তাঁদের জন্য পরিবার অপেক্ষা করে।

তাঁর কথায়, ফুটবল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জীবনের চেয়ে বড় নয়। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে খেলাটাকে উপভোগ করার জায়গাটাও হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। সমর্থকদের উদ্দেশেও একই বার্তা দিয়েছেন তিনি। ফুটবলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মারামারি এবং হিংসার ঘটনা কখনও কাম্য নয়।

ওড়িশার বিরুদ্ধে তিন পয়েন্টই লক্ষ্য

আইএসএলে এখনও জয় না পাওয়া ওড়িশা এফসির বিরুদ্ধে এই ম্যাচকে গোলের ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন না মোহনবাগান কোচ। তাঁর বক্তব্য, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিন পয়েন্ট পাওয়া। মরসুমের শেষে দল যদি চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তা হলে কোনও একটি ম্যাচে কত গোল হয়েছিল, তা কেউ মনে রাখবে না।

অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের সাম্প্রতিক ফলাফল দেখে আত্মতুষ্ট হতে নারাজ সবুজ-মেরুন শিবির।

ওড়িশার বিরুদ্ধে ম্যাচে মোহনবাগানের সামনে কয়েকটি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে—শুরু থেকেই মনোযোগ ধরে রাখা, সাহালের অনুপস্থিতিতে মাঝমাঠের সৃজনশীলতা বজায় রাখা, রক্ষণে আলবার্তো-রাহুলের বোঝাপড়াকে কাজে লাগানো এবং গোলের সুযোগ নষ্ট না করা।

কোচের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং রাহুলের নেতৃত্বে রক্ষণভাগের পারস্পরিক বোঝাপড়া এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা দলের শক্তি হলেও, এবার শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইবে মোহনবাগান।

ওড়িশার বিরুদ্ধে তাই শুধু জয় নয়, বরং আরও নিয়ন্ত্রিত, ধারাবাহিক এবং কার্যকর ফুটবল উপহার দেওয়াই সবুজ-মেরুনের প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google