Kali Puja: অন্ধকারের বুকে আলোর আরাধনা, কীভাবে শুরু হয়েছিল মা কালীর পুজো?

আলো, প্রদীপ, আতশবাজি আর ভক্তির আবহে সেজে ওঠে বাংলা। দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় আরও এক উৎসবের প্রস্তুতি—কালীপুজো (Kali Puja)। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে পালিত হয় এই বিশেষ উৎসব। দেবী কালীর আরাধনায় মেতে ওঠেন অগণিত মানুষ। কিন্তু জানেন কি, কবে থেকে শুরু হয়েছিল কালীপুজো? কীভাবেই বা বাংলার ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন মা কালী?

দেবী কালীর পৌরাণিক পরিচয়


হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দেবী কালী হলেন আদ্যাশক্তির এক উগ্র ও শক্তিশালী রূপ। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশকারী এবং ভক্তদের রক্ষাকর্ত্রী। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, অসুরদের অত্যাচারে যখন দেবলোক বিপর্যস্ত, তখন দেবী দুর্গার শরীর থেকে আবির্ভূত হন দেবী কালী। রক্তবীজ নামে এক ভয়ংকর অসুরকে বধ করার সময় তাঁর আবির্ভাবের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়লেই তার থেকে নতুন অসুরের জন্ম হত। সেই বিপদ থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে দেবী কালী তাঁর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করতে থাকেন। এভাবেই তিনি রক্তবীজকে পরাস্ত করেন। তবে অসুরবধের পর দেবীর ক্রোধ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, তাঁর তাণ্ডব থামাতে স্বয়ং মহাদেবকে তাঁর পায়ের নীচে শুয়ে পড়তে হয়। শিবের বুকে পা পড়তেই দেবীর সম্বিৎ ফেরে। এই রূপেই সাধারণত পূজিত হন মা কালী।

বাংলায় কালীপুজোর প্রচলন কীভাবে?

বাংলায় কালীপুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন হলেও বর্তমানের মতো জাঁকজমকপূর্ণ বার্ষিক শ্যামাপুজোর জনপ্রিয়তা মূলত মধ্যযুগের পর থেকে বৃদ্ধি পায়। বাংলায় কালীসাধনার প্রসারে তন্ত্রসাধনা ও শাক্তধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

কালীপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নাম। প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় শ্যামাপুজোর ব্যাপক প্রসার ঘটে। যদিও তাঁর আগে থেকেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কালী আরাধনার প্রচলন ছিল।

অন্যদিকে, কালীসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের নামও এই ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি বাংলায় গৃহস্থের উপযোগী দক্ষিণাকালী মূর্তির রূপ জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর সঙ্গে কালীমূর্তির প্রচলিত রূপের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।

কেন অমাবস্যার রাতে কালীপুজো?

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারের মধ্যে দেবী কালীর আরাধনার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, মা কালী অশুভ শক্তি, অজ্ঞানতা ও অন্ধকার দূর করে ভক্তদের জীবনে শক্তি, সাহস ও মঙ্গল নিয়ে আসেন।

এই দিন অনেকেই উপবাস করেন, রাতে দেবীর পুজো দেন এবং পরিবার ও প্রিয়জনদের মঙ্গল কামনা করেন। বাংলায় এই উৎসব শ্যামাপুজো নামেও পরিচিত।

কালীপুজো ও দীপাবলির সম্পর্ক

কার্তিক অমাবস্যার রাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিত হয় দীপাবলি। উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এই দিনে মূলত লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন থাকলেও বাংলায় এই রাত বিশেষভাবে মা কালীর আরাধনার জন্য পরিচিত। তাই কালীপুজো ও দীপাবলি একই তিথিতে পালিত হলেও দুই উৎসবের ধর্মীয় রীতি ও তাৎপর্যে রয়েছে কিছু পার্থক্য।

রামকৃষ্ণ পরমহংস থেকে রামপ্রসাদ—বাংলার কালীভক্তি

বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে মা কালীর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির এবং সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসের কালীসাধনা এই ভক্তিধারাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। অন্যদিকে, সাধক রামপ্রসাদ সেনের শ্যামাসংগীত মা কালীর প্রতি বাঙালির আবেগ ও ভক্তিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।

‘আমায় দে মা পাগল করে’ কিংবা ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’—রামপ্রসাদের মতো সাধকদের গান আজও কালীভক্তির অন্যতম পরিচয়।

আলো ও শক্তির উৎসব কালীপুজো

সময়ের সঙ্গে বদলেছে কালীপুজোর উদযাপনের ধরন। এক সময় মূলত বাড়ির পুজো ও মন্দিরকেন্দ্রিক উৎসব হলেও বর্তমানে কলকাতা-সহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় মণ্ডপ, থিমের প্রতিমা, আলোকসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয় এই উৎসব।

তবে উৎসবের বাহ্যিক জাঁকজমকের আড়ালে কালীপুজোর মূল বার্তা একই রয়ে গিয়েছে—অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধান। ভক্তদের বিশ্বাস, মা কালী শুধু শক্তির প্রতীক নন, তিনি স্নেহময়ী মাতৃরূপেও তাঁর সন্তানদের আগলে রাখেন। তাই ভয়ংকরী রূপের আড়ালেও বাঙালির কাছে তিনি পরম আপন, ঘরের মেয়ে, আবার মায়ের মতোই আশ্রয়দাত্রী।

বাংলায় কালী আরাধনা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরও আগে প্রচলিত ছিল। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতাকে পুজোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়; তাঁকেই কালীপুজোর একমাত্র প্রবর্তক বলা ঠিক হবে না।

প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর

জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google