নানা পাটেকরের শৈশব ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে তাঁকে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। কিশোর বয়সে তিনি সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করতেন এবং মাসে মাত্র ৩৫ টাকা রোজগার করতেন। সেই কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে তাঁর অভিনয়ের ভিত তৈরি করেছিল।
অভাবের মধ্যেই তিনি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। মঞ্চে অভিনয় করতে করতে ধীরে ধীরে নিজের অভিনয়শৈলী তৈরি করেন। তাঁর অভিনয়ে পরবর্তীকালে যে তীব্রতা, বাস্তবতা এবং আবেগ দেখা গিয়েছিল, তার পেছনে এই জীবনসংগ্রামের বড় ভূমিকা ছিল।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর আত্মপ্রকাশ। প্রথমদিকে তিনি ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতেন। কিন্তু নিজের অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে ধীরে ধীরে পরিচালক ও দর্শকদের নজরে আসেন। ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে তাঁর কেরিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে। মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’ এবং বিশেষ করে ‘পরিন্দা’ তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিত করে তোলে। ‘পরিন্দা’-য় অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।
১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ নানা পাটেকরের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক। ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান।
এরপর ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘শক্তি’, ‘অব তক ছাপ্পন’, ‘অপরহণ’ এবং ‘রাজনীতি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
নানা পাটেকরের অভিনয়ের আরেকটি দিক সামনে আসে ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে। উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিপুল আনন্দ দেয়। তাঁর সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন এবং চরিত্রের মধ্যে রাগ-রসিকতার মিশ্রণ ছবিটিকে স্মরণীয় করে তোলে। পরে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন।
২০১৬ সালের মারাঠি ছবি ‘নটসম্রাট’-এ নানা পাটেকর অবসরপ্রাপ্ত এক থিয়েটার অভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং তিনি মারাঠি ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান।
তবে তাঁর সিনেমার কেরিয়ার অভিনয়েই থেমে যায়নি। এর পর তিনি পরিচালনার কাজেও হাত দেন। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। ছবিটি পরিচালনার পাশাপাশি তিনি এতে অভিনয়ও করেন। যা সমাজের এক অন্য় ভয়ঙ্করতাকে তুলে ধরেছিল।
সিনেমার বাইরেও নানা পাটেকরের জীবনে ছিল দেশসেবার অধ্যায়। তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তাঁর সামরিক দায়িত্ব পালনের কথাও তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও তিনি সামাজিক কাজ থেকে দূরে সরে যাননি। অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি Naam Foundation প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি বিশেষ করে খরা ও কৃষক-সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা করার কাজে যুক্ত ছিল।
প্রায় পাঁচ দশকের কর্মজীবনে নানা পাটেকর পেয়েছেন—
-
৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
-
একাধিক Filmfare Award
-
মারাঠি চলচ্চিত্রের জন্য সম্মান
-
২০১৩ সালে পদ্মশ্রী
৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার বাড়িতে নানা পাটেকরের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর তাঁর ছেলে মালহার পাটেকর নিশ্চিত করেন। তাঁর প্রয়াণে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্র জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নানা পাটেকরের জীবন তাই শুধুমাত্র ‘অভিনেতা হওয়ার গল্প’ নয়। ১৩ বছর বয়সে ৩৫ টাকা বেতনে পোস্টার আঁকা এক কিশোর থেকে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ও পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত শিল্পী হয়ে ওঠার এই যাত্রা ভারতীয় সিনেমার অন্যতম অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
