ভারতীয় গবেষকদের দু’টি গবেষণার তথ্য় তুলে ধরে বিবিসি জানিয়েছে, হিমালয় (Himalayas) ও এর সংলগ্ন হাই অলটিটিউড বনভূমি এলাকায় মানুষের যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি পাখির জীবনযাপন ও যোগাযোগের পদ্ধতিতে প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত দু’টি ফিল্ড গবেষণায় উঠে এসেছে যে পরিকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন কীভাবে হিমালয়ান মোনাল (Lophophorus impejanus) পাখির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
পুরুষ মোনাল তার চকচকে সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের পালকের জন্য বিখ্যাত; এটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রাজ্য-পাখি এবং নেপালের জাতীয় পাখি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উত্তরাখণ্ডের গবেষকরা হিমালয়ান মোনালের ওপর দু’টি পৃথক গবেষণা চালিয়েছেন এবং এই পাখিরা যেসব প্রধান ঝুঁকির মুখে রয়েছে তা তুলে ধরেছেন। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের ভিড়ে কোলাহলপূর্ণ স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে পাখিরা পাহাড়ের আরও উঁচুতে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া, জনাকীর্ণ উপত্যকায় মানুষের সৃষ্ট কোলাহল ছাপিয়ে নিজেদের ডাক পৌঁছে দিতে তারা তাদের ডাকের সুর বা পিচ (pitch) পরিবর্তন করছে।
বিজ্ঞানীরা এই আচরণগত পরিবর্তনগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন, কারণ মোনাল পাখিটি নিচু বনাঞ্চল ও উঁচু আলপাইন তৃণভূমির মধ্যবর্তী এক সংবেদনশীল বলয়ে বসবাস করে। এটি উত্তর-পশ্চিম হিমালয় জুড়ে বিস্তৃত পরিবেশগত চাপের একটি প্রাথমিক লক্ষণ বলেও মনে করা হচ্ছে।
বিবিসি-র প্রতিবেদনে হিমালয়ের বাস্তুসংস্থান ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বিশাল সিং-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “এই দু’টি গবেষণা অন্যান্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিচ্ছে—মোনাল যদি তার ডাকের সুর ও আবাসস্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, তবে আরও সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?”
প্রথম গবেষণার ক্ষেত্রে, হেমবতী নন্দন বহুগুণা গাড়ওয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. রাজীব লোচন, দীনেশ কুমার শর্মা ও আনন্দ কুমারের নেতৃত্বে একটি দল উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ কস্তুরী মৃগ অভয়ারণ্যে মোনাল পাখির ডাক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে। গবেষক দলটি দু’টি ভিন্নধর্মী এলাকা—চোপতা উপত্যকা এবং মদমহেশ্বর উপত্যকা—থেকে ৭০০-এরও বেশি পাখির ডাক রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করে।
অডিও বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে থাকা মোনালগুলো শান্ত আবাসস্থলের মোনালগুলোর তুলনায় ধারাবাহিকভাবে অনেক উঁচু পিচ বা সুরে ডাকছিল। ডাকের সুর বা পিচ বাড়িয়ে তারা গাড়ি ও মানুষের কোলাহলের কারণে সৃষ্ট কম-কম্পাঙ্কের পটভূমির শব্দ ভেদ করে নিজেদের ডাক পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে।
যদিও এই অভিযোজন তাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করে, তবুও গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ডাকের এই পরিবর্তন মোনালদের নিজস্ব এলাকা রক্ষা বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। “এর অর্থ এই নয় যে প্রজাতিটির ডাকের কম্পাঙ্কে কোনও স্থায়ী বা বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটেছে; বরং আমাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল বিভিন্ন ধরনের শব্দ-পরিবেশের (অ্যাকোস্টিক এনভায়রনমেন্ট) প্রতি তাদের আচরণগত নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়,” লোচন বলেন।
দ্বিতীয় গবেষণায় জলবায়ু ও আবাসস্থল বিষয়ক মডেলিং ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ জুড়ে মোনাল পাখির সংখ্যা বা বিস্তৃতির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, আলপাইন তৃণভূমি অঞ্চলে মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এই পাখিরা পাহাড়ের আরও উঁচুর দিকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মোনালরা যখন বিচ্ছিন্ন সব পর্বতচূড়ার ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন তাদের আবাসস্থল ছোট হয়ে পড়ে।
“বরফ গলে যাওয়া এবং নতুন গাছপালা জন্মানোর ফলে হিমালয়ের ওপরের দিকের এলাকাগুলো এখন তাদের চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে, তাই তারা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে সরে যাচ্ছে। তাছাড়া, আলপাইন তৃণভূমিতে অবস্থিত তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল মানুষের দখলে চলে আসায় এমনিতেই তারা ওপরের দিকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে,” লোচন বলল।
প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবর
জাস্ট দুনিয়ার সঙ্গে গোটা বিশ্বকে রাখুন নিজের পকেটে। Follow Us On: Facebook, Twitter, Google
